তবুও ঈদ আসে
বাংলাদেশ দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনামলে উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার বা মব সহিংসতার দেশে পরিণত হয়েছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের মাধ্যমে এর প্রকাশ কিছুটা কমে এসেছে, তবে থেমে যায়নি।
২০২৪ এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয় গণ-অভ্যুত্থানে। সে বছর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেল জয়ী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুস। সকলের প্রত্যাশা ছিল একটা শান্তিপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা তিনি জাতিকে উপহার দিবেন। কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ানর আগে থেকে যে উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার বা মব সহিংসতা শুরু হয় তা যেন আরও পল্লবিত হয় তার আমলে।
প্রশাসন, পুলিশের উপস্থিতিতে সারাদেশে যখন তখন যাকে তাকে আক্রমণ করে মেরে মেলা, কোন স্থাপনা ধংস করে দেওয়া, রাজনৈতিক কার্যালয় জ্বালিয়ে দেওয়া নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে মব সৃষ্টিকারীরা সমবেত হয়ে সরকারি অনুমোদন আদায় করে নেয় সহিংসতা করার দাবি।
বলা হয়ে থাকে, মব জাস্টিসের প্রধান করাণগুলো হলো আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা। কিন্তু অধ্যাপক ইউনুসের পুরো শাসনামলে এটি থামাবার কোন প্রচেষ্টা তো ছিলোই না,বরং ক্ষেত্র বিশেষে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য মানুষ এই উচ্ছৃঙ্খল গণবিচারে খুন হয়েছে, আহত হয়েছে, নি:শেষ হয়ে গেছে। নারী ধর্ষণ ও নিপীড়ন অতীতের সকল রেকর্ড পার করেছে এই সময়ে। নিয়মিত নদীতে লাশ ভেসেছে সারাদেশে।
সময়ের এক অস্থির প্রহরে দেশের সামাজিক বাস্তবতায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন চোখে পড়তে শুরু করে। আইন ও শৃঙ্খলার জায়গায় অনেক সময় ভিড়ের উন্মত্ততা যেন প্রাধান্য পেতে থাকে। গুজব তৈরি করে,উত্তেজনা সৃষ্টি করে একদল মানুষ যখন দল বেঁধে বিচার করার দায় নিজের হাতে তুলে নিচ্ছিল। তখন সভ্যতার মুখে অস্বস্তির কালো ছায়া লেগেছিল কিনা সেটা ইউনুস আর তার সাথীরাই বলতে পারবেন। এই পরিস্থিতির জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না মোহাম্মদ ইউনুস। রাষ্ট্র ও সমাজে যখন শৃঙ্খলার দৃঢ় বার্তা প্রয়োজন ছিল,তখন নেতৃত্বের অবস্থান ছিল অনেকটাই উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর প্রতি নরম ও দ্ব্যর্থক। ফলে এক ধরনের নীরব প্রশ্রয় তৈরি হয়েছিল,যেখানে মব মানসিকতা ধীরে ধীরে সাহস পেতে শুরু করেছিল।
এই বাস্তবতায় আইন যেন অনেক সময় জনতার আবেগের কাছে পিছিয়ে পড়ে, আর বিচারের ভার চলে যায় উত্তেজিত ভিড়ের হাতে। এটি শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,বরং নেতৃত্বের দুর্বলতা ও নীতিগত অস্পষ্টতার ফল। একটি সমাজ যখন ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ভিড়ের শক্তিকে বিশ্বাস করতে শুরু করে,তখন তার পেছনে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন অনিবার্যভাবে এসে দাঁড়ায়। আর সেই প্রশ্নের মুখে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্ন মত দমনে এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে 'মব' বা গণ-উত্তেজনাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে এই 'মব কালচার' প্রশ্রয় পেয়েছে বিধায় সমালোচকরা তাকে এখন শাসনামল-কে মব রেজিম বলছে।
কারাগারে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ,কোন অপরাধ না করে নিপীড়িত হচ্ছে। সারাদেশে লাখ লাখ মানুষ গণমামলায় আতংকিত দিন পার করছে। এর পুরোটাই ঘটেছে ইউনুস সরকারের প্রতিহিংসা চর্চার কারণে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন চেষ্টাই দৃশ্যমান ছিল না তার সময়ে।
এমন এক বাংলাদেশ পেরিয়ে নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ঈদ এসেছে। ঈদ এসেছে মবরাজের শাসনামল থেকে তারেক রহমানের উদারনৈতিক বাংলাদেশে।
এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে জীবনের নানা রং। এই উৎসবে যেমন মিশে আছে উদ্যাপনের বৈচিত্র, তেমনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ জেগে উঠছে প্রাণের মেলায়।
এবারের ঈদ এসেছে এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে চলছে যুদ্ধ। ইরানে আমেরিকা ইসরায়েলের যৌগ হামলার পর ইরান পাল্টা হামলান করছে ইসরায়েলে, আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এসব দেশে বাস করা আমাদের নাগরিকদের কয়েকজন ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ আর তাদের পরিবার আছে দুশ্চিন্তায়। বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের দাম যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে ধাই ধাই করে।
ইউনুস জামানায় ব্যবসা লাটে উঠেছিল। এখন কিছুটা হাল ফিরবে বলে মানুষ যখন আশা করছিল তখনই এলো যুদ্ধ। শিল্প বানিজ্যের অবস্থা ভাল নয়। বহু কারখানা ও খনি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মানুষের আয়ে টান পড়ায় বিনোদনের ক্ষেত্রেও খরচ কমেছে।
ঈদের আগমনী হাওয়া যেন প্রতি বছরই একইভাবে বয়ে আসে, কিন্তু মানুষের জীবন, সময়ের স্রোতে বদলে যায় নীরবে। একসময় যে জনপদে শিল্প ও বাণিজ্যের চাকা অবিরাম ঘুরত, আজ সেখানে অনেকটা নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। ধোঁয়া উড়িয়ে চলা বহু কারখানার চিমনি আজ নিভে গেছে; একসময়ের কর্মচঞ্চল খনিগুলোতেও যেন জমেছে দীর্ঘ নীরবতা। শ্রমিকদের কোলাহল, যন্ত্রের শব্দ, ব্যস্ত মানুষের পদচারণা-সবকিছু যেন ধীরে ধীরে স্মৃতির ভাঁজে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
এই পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। অনেক পরিবারেই এখন আয়ের ধারাটি আগের মতো প্রবাহিত নয়। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে মানুষকে প্রতিটি খরচ ভেবে চিন্তে করতে হয়। বাজারের থলিতে আগের মতো জিনিস ওঠে না, নতুন কাপড় কেনার আনন্দেও জড়িয়ে থাকে একটুখানি দ্বিধা। বিনোদনের ক্ষেত্রেও সেই টান স্পষ্ট। মেলা, সিনেমা, বেড়ানো কিংবা ছোটখাটো আনন্দের আয়োজনগুলো অনেক সময়ই থমকে যায় সংসারের প্রয়োজনের সামনে।
তবু জীবন থেমে থাকে না। মানুষের মনেও আশা নিভে যায় না এত সহজে। বছরের পর বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে যে উৎসবের আলো জ্বলে এসেছে, সেটিও নিভে যায় না। তাই সব কিছুর মধ্যেও ঈদ ঠিকই আসে-নীরবে, ধীর পায়ে, কিন্তু গভীর এক স্নিগ্ধতা নিয়ে।
ঈদের চাঁদ যখন আকাশে ওঠে,তখন যেন মানুষের মনের ভেতরেও একটুখানি আলো জ্বলে ওঠে। হয়তো নতুন পোশাক সবার জন্য কেনা সম্ভব হয় না, তবুও ছোট্ট উপহার কিংবা সাদামাটা রান্নায়ও উৎসবের স্বাদ খুঁজে পায় মানুষ। প্রতিবেশীর দরজায় কড়া নেড়ে কুশল জিজ্ঞেস করা,আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, শিশুদের হাসি-এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তখন হয়ে ওঠে ঈদের আসল আনন্দ।
অভাব আর সংকটের মাঝেও ঈদের এই আগমন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়-আনন্দের উৎস কেবল সম্পদে নয়,মানুষের হৃদয়ের উষ্ণতায়। কারখানা বন্ধ হতে পারে, বাজারে মন্দা আসতে পারে, জীবনের হিসাব কঠিন হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু মানুষের আশা, ভালোবাসা আর মিলনের আকাঙ্ক্ষা এত সহজে নিভে যায় না।
এই কারণেই, সময় যতই কঠিন হোক, মানুষের জীবনে ঈদ ঠিকই ফিরে আসে। যেন সে বলে যায়, অন্ধকারের মধ্যেও আলো আছে, কষ্টের ভেতরেও আছে মিলনের সম্ভাবনা,আর মানুষের হৃদয়ে আছে অমলিন এক উৎসবের অপেক্ষা।
Comments