আগের অবস্থানে নতুন করে নিয়ে যাওয়া হোক ৫ শরিয়া ব্যাংক-কে
দেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হলো পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি' গঠন। তীব্র তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের ভার এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার মধ্যে পড়ে যাওয়া কয়েকটি ব্যাংককে বাঁচাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর আগেই নতুন এই ব্যাংক নানা অনিশ্চয়তা ও সংকটে জড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়ার পদত্যাগ সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
গত বছরের ৭ ডিসেম্বর সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াকে নবগঠিত ব্যাংকটির প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার দায়িত্ব ছিল পাঁচটি ব্যাংকের জটিল আর্থিক বাস্তবতা সামলে একটি শক্তিশালী নতুন ব্যাংক গড়ে তোলা। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মাথায় তার পদত্যাগ ব্যাংকটির নেতৃত্বে অস্থিরতার বার্তা দিয়েছে। একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থিতিশীল নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শুরুতেই চেয়ারম্যান পদ শূন্য হয়ে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ।
শুধু চেয়ারম্যান পদেই নয়, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে যোগ দেননি। ফলে ব্যাংকটির শীর্ষ দুই পদই কার্যত অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি একটি নতুন ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রম শুরু করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই ব্যাংকটি গঠিত হয়েছে পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করে। এক্সিম ব্যাংক,সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক,ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক,ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে এক্সিম ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের হাতে। গত কয়েক বছরে এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তারল্য সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে অনেক আমানতকারী চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের অর্থ তুলতে পারছিলেন না।
এই পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহকের জমা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এত বিপুল সংখ্যক আমানতকারী ও বিপুল অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল একীভূতকরণের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সংকট কাটানোর বদলে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতের মুনাফার ওপর 'হেয়ারকাট' নীতি আরোপ করেছে, যার ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য আমানতকারীরা মাত্র ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই আমানতকারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
সরকার ইতোমধ্যে এই ব্যাংকের মূলধনে ২০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারি সুকুকে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাকি অর্থ থেকে আমানত ফেরত দেওয়া ও পরিচালন ব্যয় মেটানো হচ্ছে। কিন্তু মাসে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সে তুলনায় আয় নেই। ফলে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর আগেই ব্যাংকটি লোকসানের চাপে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো খেলাপি ঋণের মাত্রা। পাঁচ ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই খেলাপি বলে জানা গেছে। পাশাপাশি সঞ্চিতি ঘাটতি প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল আর্থিক ঘাটতি পূরণ করা যে সহজ কাজ নয়, তা বলাই বাহুল্য। যদি দ্রুত কার্যকর সংস্কার ও ঋণ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া না যায়,ু তবে নতুন ব্যাংকটিও একই সমস্যার মধ্যে আটকে পড়তে পারে।
অন্যদিকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কয়েকজন উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো একীভূত হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না এবং এই সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেছে। আদালতের এই আইনি প্রক্রিয়াও ব্যাংকটির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে নতুন সরকার। এই সরকারের অবস্থান কী হবে-একীভূতকরণ বহাল থাকবে নাকি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে-তা এখনো স্পষ্ট নয়। ব্যাংকের গ্রাহক এবং কর্মীরা মনে করেন, একীভুতকরণ স্থগিত করে ব্যাংকগুলোকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ নতুন করে গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় সহযোগিতায় চালু করা হোক।
বাস্তবতা হলো,দেশের ব্যাংক খাতে আস্থা সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি লাখো আমানতকারীর আস্থা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।
এখন প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা। সরকার যদি শক্তভাবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারে, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং সুশাসন নিশ্চিত করে, তবে এই ব্যাংক নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। অন্যথায়, বড় মূলধন নিয়েও এটি দেশের ব্যাংক খাতের আরেকটি ব্যর্থ পরীক্ষায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
প্রশ্ন তাই থেকেই যায়-রাষ্ট্রীয় অর্থে গঠিত এই বৃহৎ ব্যাংক কি সত্যিই দেশের ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে পারবে,নাকি অনিশ্চয়তার ভারেই এর যাত্রা থমকে যাবে?
Comments