সুশীল সমাজ, অনির্বাচিত সরকার ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথচলা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার আমাদের সামনে এক জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সংকট দেখা দিলেই একটি অংশের দৃষ্টি ঘুরে যায় "নিরপেক্ষ" বা অনির্বাচিত ব্যবস্থার দিকে। বাংলাদেশ-এর পথচলায় ২০০৭ সালের ১/১১-এর ঘটনাপ্রবাহে ফখরুদ্দিন আহমেদ-এর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার হোক কিংবা ২০২৪ সালে মুহাম্মদ ইউনুস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার হোক। প্রতিবারই একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে: রাজনৈতিক অচলাবস্থার সমাধান কি রাজনীতির ভেতরে, নাকি তার বাইরে? সুশীল সমাজের একাংশ যখন দলীয় দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি সমর্থন জানায়, তখন তা কেবল তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করে না; বরং গণতন্ত্রের চরিত্র, প্রতিনিধিত্বের ধারণা এবং জনগণের ভোটাধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়। এই দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা নাকি তাকে পাশ কাটানো তা প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন উঠছে-বাংলাদেশের একাংশ সুশীল সমাজ কেন বারবার অনির্বাচিত সরকারের প্রতি সমর্থন বা প্রত্যাশা প্রকাশ করে? তারা কি রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে সরিয়ে "বিরাজনীতিকরণ"-এর দিকে ঠেলে দিতে চান? নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীরতর রাজনৈতিক হতাশা ও কাঠামোগত সংকট?
২০০৭ সালের ১/১১–এর প্রেক্ষাপট ছিল তীব্র রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সহিংসতা ও নির্বাচনকে ঘিরে আস্থাহীনতা। সে সময় অনেক সুশীল ব্যক্তি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি "নিরপেক্ষ" প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই সময় "মাইনাস টু ফর্মুলা"-অর্থাৎ প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ধারণা। এটি শেষ পয়ন্ত জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কারণ বাংলাদেশে রাজনীতি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, গণআন্দোলন ও দলভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই জনগণ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণের পক্ষে অবস্থান নেয়।
২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহেও অনুরূপ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। একটি অংশ মনে করে, যখন দলীয় রাজনীতির মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়, তখন সুশীল সমাজ বিকল্প নেতৃত্ব বা অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করে। কিন্তু এই অবস্থান অনেক সময় রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিবাদী সমাধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার জন্ম দেয়। ফলে গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি-জনমত, নির্বাচন ও রাজনৈতিক দল-দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতিকদের ঘৃণা করলেও দেশে সুশাসন দিতে পারেনে অধ্যাপক ইউনুসের ১৮ মাসের সরকার।
"বিরাজনীতিকরণ" ধারণাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি মানেই দ্বন্দ্ব, মতভেদ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু যখন সুশীল সমাজের একটি অংশ রাজনীতিকে সমস্যার মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সমাধান হিসেবে "অরাজনৈতিক" বা "নিরপেক্ষ" শাসনব্যবস্থার কথা বলে, তখন তারা অজান্তেই গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রাণশক্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। গণতন্ত্রে সমস্যার সমাধান রাজনীতির ভেতর থেকেই আসতে হয়। সবকিছু করতে হয় সংলাপ, সংস্কার ও নির্বাচনের মাধ্যমে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো মৌলবাদী বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থান। যখন মূলধারার রাজনীতি দুর্বল বা বিভক্ত হয়, তখন প্রান্তিক শক্তিগুলো সুযোগ পায়। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক শূন্যতা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী থাকে না; সেটি অন্য কেউ পূরণ করে। ফলে যদি গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক ও বহুত্ববাদী শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে মৌলবাদী বা চরমপন্থী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। এ কারণেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী রাখা জরুরি।
তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশের জনগণ বারবার ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। তারা সামরিক শাসন প্রত্যাখ্যান করেছে, চরমপন্থা প্রতিহত করেছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চেয়েছে। জনগণের এই অবস্থান প্রমাণ করে-বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা একটি উদারনৈতিক, বহুত্ববাদী ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তারা চায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং সকল মতাদর্শের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
সুশীল সমাজ রাজনৈতিক বিকল্প তৈরির কাজ করে। নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দলীয় গণতন্ত্রের বিকাশ-এসব ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা রাখাই হতে পারে তাদের দায়িত্ব। কিন্তু যদি তারা নির্বাচিত রাজনীতিকদের অগ্রাহ্য করে প্রশাসনিক সমাধানকে প্রাধান্য দেন, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে সেটাই হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-এসব মূল্যবোধকে সমন্বিত করেই একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে। জনগণের ভোটই সেই পথের প্রধান ভিত্তি।
সবশেষে বলা যায়, অনির্বাচিত সরকারের প্রতি আকর্ষণ মূলত রাজনৈতিক সংকটের লক্ষণ, সমাধান নয়। বাংলাদেশের মানুষ যে বহুত্ববাদী ও উদারনৈতিক পথ চায়, তা কেবল শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। তাই সমাধান খুঁজতে হলে রাজনীতিকে বাদ দিয়ে নয়, বরং রাজনীতিকেই আরও দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে হবে। তবেই দেশ এগোবে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে।
Comments