খামেনি কেন এত নিষ্ঠুর ছিলেন?
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন আলি খামেনি। খামেনি ছিলেন ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মূল আদর্শিক নেতা,যার নেতৃত্বে পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখেন খামেনি। এই কাঠামো একদিকে যেমন দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করেছে,অন্যদিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়েছে।
সেই ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আলি খামেনি। সাইত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এই নেতা সমর্থকদের কাছে ইসলামী বিপ্লবের ধারক ও বাহক,আর সমালোচকদের কাছে এক কেন্দ্রীভূত,কঠোর ও দমনমূলক শাসনের প্রতীক। খামেননিকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে-আন্দোলন দমন,নারীর অধিকার,অর্থনৈতিক সংকট,আঞ্চলিক রাজনীতি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি।
খামেনির শাসনামল অভিযোগিত নিষ্ঠুরতার ইতিহাস
আগেই বলেছি, আলি খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তাঁর আমলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও কঠোর দমননীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। নিচে প্রধান কিছু বিতর্কিত ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
১) রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন
১৯৯০-এর দশক থেকে বহু সংস্কারপন্থী রাজনীতিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন এবং ২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়।
- মীর হোসেন মুসাভি ও মেহদি কারোনি নামের দুই নাগরিক অধিকার কর্মী ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর দীর্ঘদিন গৃহবন্দি ছিলেন।
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে,ব্যাপক গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ঘটনা ঘটেছে।
২) ১৯৮৮ সালের বন্দি মৃত্যুদণ্ড
১৯৮৮ সালে,যখন তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন,ইরানে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। এই ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা হয়েছে।
৩) ২০১৯ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বিক্ষোভ
২০১৯ সালে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী,নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শত শত মানুষ নিহত হন। সরকার সংখ্যাটি অনেক কম বলে দাবি করে।
৪) মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিতকরণ
- সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
- বহু সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী গ্রেপ্তার।
- ইন্টারনেট বন্ধ বা সীমিত করার ঘটনা (বিশেষ করে ২০১৯ ও ২০২২ সালে)।
৫) ২০২২ সালের বিক্ষোভ
মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনপীড়নে বহু হতাহতের অভিযোগ ওঠে। ২০২৫/২৬ সালেও তিনি কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করেন। হত্যা করা হয় হাজার হাজার মানুষকে।
তিনি কেন এত নিষ্ঠুর ছিলেন নারীদের প্রতি
আলি খামেনিকে "নারীদের প্রতি নিষ্ঠুর" বলা হয় মূলত তাঁর শাসনামলে নারীদের অধিকার সীমিত করা,কঠোর পোশাকবিধি প্রয়োগ এবং নারী–অধিকার আন্দোলনের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের অভিযোগের কারণে। বিষয়টি সমালোচনামূলকভাবে দেখলে কয়েকটি কারণ সামনে আসে:
১) বাধ্যতামূলক হিজাব ও পোশাকবিধি
ইরানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই বাধ্যতামূলক হিজাব আইন চালু। খামেনির সময় এই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
- "নৈতিকতা পুলিশ" নারীদের পোশাক পর্যবেক্ষণ করে।
- ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এই আইন ও তার প্রয়োগ বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হয়।
সমালোচকদের মতে,এটি ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন; সরকারের মতে,এটি ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার অংশ।
২) আইনি ও সামাজিক বৈষম্য
সমালোচকরা বলেন,ইরানের পারিবারিক আইন ও ফৌজদারি আইনে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় কম অধিকার পায় (যেমন: উত্তরাধিকার, সাক্ষ্য, বিবাহ ও তালাকের বিধান)।
খামেনি প্রকাশ্যে "পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকা"কে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নারীদের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে মাতৃত্ব ও পরিবারকে তুলে ধরেছেন।
৩) নারী-অধিকার আন্দোলন দমন
নারী অধিকারকর্মী,সাংবাদিক ও বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে ২০২২ সালের বিক্ষোভে কঠোর দমননীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে।
৪) আদর্শগত অবস্থান
খামেনির রাজনৈতিক দর্শন ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে। এই কাঠামোয় ধর্মীয় ব্যাখ্যার আলোকে সামাজিক নীতি নির্ধারিত হয়। তাঁর সমর্থকেরা বলেন,এটি পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব ঠেকাতে ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষায় প্রয়োজনীয়। সমালোচকেরা বলেন,এতে নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।
সংক্ষেপে
"নিষ্ঠুরতা" শব্দটি হয়তো মূল্যায়নভিত্তিক। তবে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অধিকারকর্মী তাঁর নীতিকে নারীদের প্রতি কঠোর ও দমনমূলক বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নীতিমালা রক্ষা করেছেন।
Comments