প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ দুই পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। গতকাল রোববার সেনাবাহিনীর আটটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করা হয়। পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ জ্যেষ্ঠ পদগুলোতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বর্তমানে শুধু সচিব ও সমপর্যায়ের পদে অন্তত ১৫ কর্মকর্তা চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা ছাড়াও দায়িত্বে থাকা সচিবসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বড় অংশই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপির পছন্দে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে এই কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন। তৎকালীন সরকারের পছন্দে এবং জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বরাতে যাদের পদায়ন হয়েছিল, তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে।
রদবদলে দুই সেনা কর্মকর্তা পররাষ্ট্রে
সরকার গঠনের পাঁচ দিনের মাথায় গতকাল সেনাবাহিনীর আটটি জ্যেষ্ঠ পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেনাসদর থেকে জারি করা আদেশ অনুযায়ী, চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে তাঁর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। পিএসও হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান। এর আগে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন তিনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ডিজিএফআইর মহাপরিচালক পদে আসতে যাচ্ছেন কায়সার রশিদ চৌধুরী। বর্তমানে সেনাসদরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের দায়িত্বে থাকা এ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতির পর যোগদান করবেন। ডিজিএফআইর বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হচ্ছে।
মেজর জেনারেল জেএম ইমদাদুল ইসলামকে ৫৫ পদাতিক ডিভিশন থেকে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে (ইবিআরসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ পদে থাকা মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসানকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করা হয়েছে।
দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাসের ডিফেন্স অ্যাডভাইজার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাফিজুর রহমানকে মেজর জেনারেলে পদোন্নতি দিয়ে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনে পরিবর্তন
সচিবালয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ধাপে ধাপে পরিবর্তন আসবে জনপ্রশাসনে। সরকার গঠনের আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং শপথের পর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পদে বদল এসেছে। সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অগ্রাধিকারের কাজে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন সরকার গঠনের আগের তিন দিনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া সরে যান। চুক্তিতে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হয়েছেন এ বি এম আবদুস ছাত্তার। তিনি বিএনপির চেয়াপারসন খালেদা জিয়া এবং চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত সচিব ছিলেন।
রদবদলের আলোচনায় যারা
শূন্য থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে– এ আলোচনা চলছে কয়েক দিন ধরে। জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ যাকে চাইবেন, তিনি নিয়োগ পাবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. মো. মোখলেস উর রহমান ও এম এ আকমল হোসেন আজাদ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মমতাজ আহমেদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এহছানুল হক, নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (জ্যেষ্ঠ সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদসহ চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের রদবদলের আলোচনাও রয়েছে সচিবালয়ে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; কৃষি, প্রতিরক্ষা, অর্থ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, রেলপথ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, স্বাস্থ্যসেবা এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব পদে রদবদলের আলোচনা চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম ছয় মাসে জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব এবং সচিব মর্যাদার ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল। জ্যেষ্ঠ সচিব, সচিব, সচিব মর্যাদার ২৫ এবং অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে ওএসডি করে।
গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের সভায় জানিয়ে দেন, পদায়ন ও বদলিতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করবে না সরকার।
পুলিশে পরিবর্তনের আভাস
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার পদে পরিবর্তন আনে। আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনার পদে বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত অবসরপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে এনে দুই বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রদবদল হতে পারে। গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে শিগগির পরিবর্তন আসতে পারে।
বাহারুল আলমের চুক্তি বাতিল হলে আইজিপি পদে কে আসতে পারেন– এ নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন বিসিএস ১২ ব্যাচের কর্মকর্তা হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত আইজি আলী হোসেন ফকির, র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের কমিশনার হাসিব আজিজ, রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান, সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি এ কে এম আওলাদ হোসেন, সিআইডির প্রধান ছিবগাত উল্লাহ, অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান শেখ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান ও অতিরিক্ত আইজি মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
ডিএমপি কমিশনার হিসেবে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ, সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম আলোচনায় রয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, পদোন্নতি বা চুক্তিতে নিয়োগ পেতে অনেকে চেষ্টা করছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের নেই।
পদ হারানোর ভয়ে উপাচার্যরা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৪৮ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির পছন্দে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ দেয়। কয়েকজন উপাচার্য নিয়োগ পান জামায়াতের তালিকা থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। গতকাল শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে দেখা করে গতকাল পদত্যাগপত্র দেন। উপাচার্যের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে 'বিদায়ী শুভেচ্ছা' লেখা ফুলের তোড়া তুলে দেন মন্ত্রী।
অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ দেওয়া ৫৬ জন উপাচার্যের বেশি বিএনপির শিক্ষক রাজনীতিতে যুক্ত। যদিও গত বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছিলেন, দেশের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি জামায়াতের।
শিক্ষক রাজনীতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশির ভাগ প্রকৌশল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিরা জামায়াত সমর্থক শিক্ষক রাজনীতিতে যুক্ত। তাদের সরাতে পারে নতুন সরকার। আবার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিএনপিপন্থি হলেও, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের ভূমিকায় দলটি নাখোশ। এর বাইরে রাজধানীর প্রকৌশলসংশ্লিষ্ট একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকেও অপসারণ করা হতে পারে। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে ভিসি প্যানেলে ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের খণ্ডকালীন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে উপাচার্য নিয়োগে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব ছিল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে 'জনতার চাপ'ও কাজ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকার অতি আগ্রহী হয়ে উপাচার্যদের অপসারণ করতে চায় না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. মনজুর আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে রদবদল কাম্য নয়।
Comments