ভয়, মামলা আর নীরবতার খাঁচায় বন্দী সাংবাদিকতা
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় ২০২৫ সাল বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সময়। সংখ্যার হিসেবে এটি হয়তো আরেকটি বছর মাত্র, কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে রক্ত, ভাঙা শরীর, ভাঙা কলম এবং ভাঙা কণ্ঠ। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো-ভাঙা সাহস। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় পক্ষের চাপ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব আক্রমণ, মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়-সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা এখন আর পেশা নয়, যেন এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিযাত্রা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৮১টি নিপীড়ন, হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে আছে কোনো না কোনো প্রতিবেদকের আহত শরীর, কোনো পরিবারে আতঙ্ক, কোনো সংবাদকক্ষে স্তব্ধতা। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, প্রকাশিত সংবাদের জেরে মামলা, প্রাণনাশের হুমকি এমনকি হত্যাকাণ্ড, সবই যেন এখন সাংবাদিকতার 'নিয়মিত ঝুঁকি' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, প্রকাশিত সংবাদের কারণে ৭১টি মামলা। বিশ্বজুড়েই এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এখানে অপরাধটি কী? সত্য বলা, প্রশ্ন তোলা, ক্ষমতার জবাবদিহি চাওয়া। এই মামলাগুলো আসলে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় - লিখবে না, বলবে না, দেখাবে না। নইলে শাস্তি অবধারিত।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা আরও ভয়াবহ। ২০২৫ সালে ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক হত্যা, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। একজন নিহত হয়েছেন-একজন মানুষের জীবন, একটি কণ্ঠ, একটি কলম চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ২৯৫ জন আহত হয়েছেন, ১৬৩ জন লাঞ্ছিত বা হুমকির শিকার হয়েছেন, ১৭০ জন পড়েছেন আইনি হয়রানির ফাঁদে। ৪৬টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এই সংখ্যা দেখলে প্রশ্ন জাগে-এটি কি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চিত্র? কোন ভয়ভিত্তিক শাসনের প্রতিচ্ছবি?
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার হিসাব আলাদা হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে তারা একমত-সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে অবনতির দিকে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) বলছে, ২০২৫ সালে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। স্কোর মাত্র ৩৩.৭১। নিরাপত্তা সূচকে অবস্থান আরও নিচে-১৫৯তম। এই পরিসংখ্যান কোনো বিচ্ছিন্ন সমালোচনা নয়; এটি বৈশ্বিক মূল্যায়ন। একই বছরে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলায় কমপক্ষে পাঁচজন সাংবাদিক আটক হওয়ার তথ্যও দিয়েছে আরএসএফ।
আরএসএফের বিশ্লেষণ আরও একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনে। বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও কয়েক শ অনলাইন সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশাল এক মিডিয়া জগৎ। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই বিপুল মাধ্যম কতটা স্বাধীন? আরএসএফ বলছে, অতীতে অনেক সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সহায়ক ছিল এবং বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকেও বিরত রয়েছে। অর্থাৎ সরকার বদলালেও সাংবাদিকতার চরিত্র বদলায়নি; বদলায়নি আত্মনিয়ন্ত্রণ, বদলায়নি ভয়।
এখানেই এসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রশ্নটি সামনে আসে। বহু মানুষের আশা ছিল, এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রব্যবস্থার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমেও একটি মৌলিক পরিবর্তন আনবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই আশা অনেকটাই ভ্রান্ত। সংবাদমাধ্যমের কাঠামো, মালিকানা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সবচেয়ে বড় কথা-ভয়ের সংস্কৃতি, সবই প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও ক্ষমতার প্রতি সাংবাদিকতার সম্পর্ক বা দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি।
আজ বাংলাদেশে সাংবাদিকতা যেন দুই দিক থেকে চাপে। একদিকে রাষ্ট্রীয় আইন, মামলা, গ্রেপ্তার; অন্যদিকে বেসরকারি শক্তি-রাজনৈতিক কর্মী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, মব। মব আক্রমণ এখন নতুন এক আতঙ্ক। কোনো প্রতিবেদন বা ফেসবুক পোস্টের জেরে সাংবাদিককে ঘিরে ধরে মারধর, লাঞ্ছনা-এ যেন প্রকাশ্য বিচারবহির্ভূত শাস্তি। রাষ্ট্র অনেক সময় নীরব দর্শক, কখনো পরোক্ষ সমর্থক।
এই পরিস্থিতিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ-সেন্সরশিপ সাংবাদিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। কোন খবর করা যাবে, কোনটা যাবে না-এই সিদ্ধান্ত আর সম্পাদকীয় নীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা নির্ধারিত হয় সম্ভাব্য মামলার ভয়, হামলার আশঙ্কা আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব কষে। এর ফলাফল ভয়াবহ আর তা হলো সমাজ সত্য জানে না, ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, গণতন্ত্র ফাঁপা হয়ে পড়ে।
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনস্বার্থের রক্ষাকবচ। কিন্তু যখন সেই রক্ষাকবচই ভেঙে যায়, তখন সমাজ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও সহিংসতার সামনে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশে ঠিক সেটাই ঘটছে। সংখ্যাগুলো আমাদের সতর্ক করছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো-আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?
যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে সামনে যে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে হয়তো সংবাদমাধ্যম থাকবে, কিন্তু সাংবাদিকতা থাকবে না। থাকবে না প্রশ্ন, থাকবে না অনুসন্ধান, থাকবে না সত্যের সাহস। ২০২৫ সাল শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এখনই যদি এই ভয়, এই নিপীড়ন, এই নীরবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো না যায়, তাহলে আগামী বছরগুলোতে কলম নয়-শুধু শাসকের প্রতিধ্বনিই শোনা যাবে।
Comments