মধ্যপ্রাচ্যে কি আবারও যুদ্ধের দামামা বাজছে?
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা হঠাৎ করে যে মাত্রায় বেড়েছে, তা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। পরিস্থিতিকে আর 'রুটিন রোটেশন' বা 'ডিটারেন্স এক্সারসাইজ' বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যখন এই তৎপরতার প্রতিটি ধাপ গত বছরের জুনে ইরানের ওপর চালানো মার্কিন হামলার ঠিক আগের প্রস্তুতির সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। ইতিহাস যখন নিজেকে এভাবে পুনরাবৃত্ত করে, তখন সেটাকে কাকতালীয় বলা বোকামি।
১ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটির ডজন ডজন সি-১৭ গ্লোব মাস্টার পরিবহন বিমান যুক্তরাজ্য হয়ে কাতারের আল উদেইদ এবং সৌদি আরবের দিকে উড়ে যাচ্ছে। অনেকগুলো ইতোমধ্যেই পৌঁছেও গেছে। এই বিমানগুলো শুধুই সেনা পরিবহন করে না; এগুলো যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুতির নিঃশব্দ বার্তাবাহক। ভারী অস্ত্র, বিশেষ অভিযান ইউনিট, গোলাবারুদ ও লজিস্টিক সাপোর্ট, সবকিছুর প্রথম ধাপ এই সি-১৭ ফ্লাইট।
এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের একটি বিমান ঘাঁটিতে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৬০তম সোর ইউনিট। এই ইউনিট সাধারণত তখনই মোতায়েন হয়, যখন সামনে থাকে গভীর রাতের বিশেষ অভিযান, শত্রুর ভূখণ্ডে প্রবেশ, টার্গেটেড স্ট্রাইক বা রেজিম-ডি ক্যাপিটেশন মিশন। ইতিহাস বলে, এসব নাইট স্টকার্স কখনোই শুধু 'প্রেজেন্স শো' করার জন্য পূর্বমুখী হয় না।
একই সময়ে এসি- ১৩০ জে গানশিপ কাছাকাছি ঘাঁটিতে নামানো হয়েছে, যা মানেই ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট ও শহুরে অবকাঠামো টার্গেটিংয়ের প্রস্তুতি। আকাশে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালীর ওপর চক্কর কাটছে এমকিউ ট্রাইটন ড্রোন। এসবের লক্ষ্য ইরানের নৌ চলাচল, ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ও রাডার প্যাটার্ন পর্যবেক্ষণ করা। এমন সব কমব্যাট ব্যবস্থাপনা কোনো সাধারণ উত্তেজনার সময় চালানো হয় না।
থিয়েটারে রয়েছে দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি-ইউএসএন কার্ল ভিনসন এবং ইউএসএস নিমটিজ। প্রায় ১৮০টির মতো যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে রয়েছে এফ-৩৫ সি, এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট। অর্থাৎ, আকাশে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মতো শক্তি আগে থেকেই জড়ো করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো – এতসব আয়োজন কীসের জন্য?
বিষয়টি ভয়ংকর জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ঠিক এই একই প্যাটার্ন দেখা গিয়েছিল জুন ২০২৫-এ, অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের আগে। তখনও একইভাবে সি-১৭ ফ্লাইট, একইভাবে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি তৈরি করে রাখা হয়েছিল, একইভাবে বিশেষ অভিযান ইউনিট ও আইএস আর ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছিল। তার ফলাফল ছিল ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জে ৩০,০০০ পাউন্ডের বাঙ্কার-বাস্টার বোমা নিক্ষেপ।
এর মধ্যেই ২ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। তিনি বলেছেন-"ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, আমরা তাদের উদ্ধার করতে আসব।"
এই বাক্যটি মানবাধিকারের ভাষায় মোড়ানো হলেও, বাস্তবে এটি একটি কন্ডিশনাল মিলিটারি থ্রেট। পেন্টাগন নীরব থেকেছে-আর মার্কিন সামরিক ইতিহাসে পেন্টাগনের নীরবতা অনেক সময়ই সবচেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলে।
ইরান এই বার্তা হালকাভাবে নেয়নি। দেশজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, সকল বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনি সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন-পূর্ণ প্রস্তুতি বজায় রাখতে। একই সঙ্গে নানা রিপোর্টে উঠে আসছে যে, খামেনির ঘনিষ্ঠ বলয় স্বর্ণ ও পরিবারকে মস্কোর দিকে সরাচ্ছে। তথ্যগুলো পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার, প্রতিরোধের পাশাপাশি খামেনি নিজের একটি এক্সিট প্ল্যানও প্রস্তুত করে রেখেছেন।
এটি হতে পারে ডিটারেন্স বা বাস্তব যুদ্ধের প্রস্তুতি। কিন্তু ডিটারেন্স তখনই কাজ করে, যখন অপরপক্ষ বিশ্বাস করে হামলা হতে পারে। আর সেই বিশ্বাস তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র যা যা করা দরকার, তার সবকিছুই এখন দৃশ্যমান।
এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া। রিপোর্ট অনুযায়ী, হাইপারসনিক মিসাইল ইতোমধ্যেই ইরানে পৌঁছেছে, যেগুলোর টার্গেটিং স্পষ্টতই ইসরায়েলকে মাথায় রেখে। সিরিয়ায় রাশিয়ার গোপন সেল সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে ইসরায়েল সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো সুবিধা নিতে না পারে। অর্থাৎ, এটি আর কেবল ওয়াশিংটন বনাম তেহরান নয়; এটি হয়ে উঠছে একটি মাল্টি-থিয়েটার সংঘাতের সম্ভাব্য সূচনা।
ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন সত্য শেখায়, যখন নাইট স্টকার্স যুক্তরাজ্য থেকে পূর্বমুখী হয়, সেটি সাধারণ মহড়া থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে যুদ্ধের নীরব ঘোষণা। প্রশ্ন এখন একটাই -এই প্রস্তুতি কি শুধু ভয় দেখানোর জন্য, নাকি বিশ্ব আরেকটি 'মিডনাইট' মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ কখনো একা থাকে না। একটি হামলা মানেই চেইন রিঅ্যাকশন। আর সেই আগুনে পুড়বে শুধু ইরান বা ইসরায়েল নয়, পুরো অঞ্চল, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা। ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগোচ্ছে। আর ইতিহাস সাধারণত আগেই সংকেত দেয়, যদি কেউ তা পড়তে জানে।
Comments