বাইরের দুনিয়া কি তবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের জন্য?
বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান নেমে যাওয়া, গণহারে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল হওয়া, বিভিন্ন দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পর এখন বাংলাদেশিদের কপালে জুটেছে আমেরিকায় যেতে গেলে ভিসা বন্ড। বিষয়গুলো জনমনে প্রশ্ন তুলছে যে, তবে কি বাংলাদেশিদের জন্য বহির্বিশ্বের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখন কেবল একটি ভ্রমণ নথি নয়, এটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বৈশ্বিক অবিশ্বাসের প্রতীক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাসপোর্টের মান নেমে যাওয়া, গণহারে ভিসা বাতিল, বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশিদের বহিষ্কার-এসব ঘটনাকে আর বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি। অর্থাৎ আমেরিকায় যেতে চাইলে আপনাকে আগে অর্থ জমা রেখে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি 'ঝুঁকিপূর্ণ নন'। এই শর্ত আসলে ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় নাগরিক অবমূল্যায়ন।
ভিসা বন্ডের ধারণাটাই অপমানজনক। এটি ধরে নেয় যে, বাংলাদেশি নাগরিক মানেই সম্ভাব্য অবৈধ অভিবাসী। আপনি ছাত্র, গবেষক, চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগী কিংবা স্বল্প সময়ের পর্যটক - আপনার পরিচয়ের আগে আপনার জাতীয়তা আপনাকে সন্দেহভাজন বানিয়ে দেয়।
প্রশ্ন হলো, কেন এই সন্দেহ? এর উত্তর খুঁজতে হলে কেবল বিদেশি নীতির দিকে তাকালে চলবে না; তাকাতে হবে নিজের রাষ্ট্রব্যবস্থার আয়নায়।
একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি নির্ভর করে সেই দেশের শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। যখন দেশে দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব বাড়ে, বৈধ অভিবাসনের পথ সংকুচিত হয়, মানব পাচার ও ভিসা জালিয়াতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নিজেদের মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তার ফল ভোগ করেন সাধারণ নাগরিকরা।
সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো এই সংকটের দায় যাদের, তারা এর ভোগান্তিতে পড়ে না। পড়েন সেই তরুণ শিক্ষার্থী, যিনি উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দূতাবাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন; সেই রোগী, যিনি উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশ ছাড়তে চান; সেই কর্মী, যিনি বৈধ কাগজপত্র নিয়েও বিমানবন্দরে সন্দেহের চোখে পড়েন। রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বোঝা তাদের কাঁধেই চাপে।
আমরা প্রায়ই উন্নয়নের সূচক নিয়ে গর্ব করি, প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে উচ্চাশা তৈরি করি। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ধরা পড়ে তখনই, যখন তার নাগরিকরা বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারে। আজ যদি বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা মানেই হয় অতিরিক্ত প্রশ্ন, অতিরিক্ত শর্ত আর আর্থিক জামানত, তবে বুঝতে হবে কোথাও গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন স্বীকারোক্তি। সমস্যা অস্বীকার করে বা সব দায় 'বিদেশি ষড়যন্ত্র' বলে উড়িয়ে দিলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনীতি, অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার, মানব পাচার ও ভিসা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, এবং সর্বোপরি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা।
পাসপোর্টের রঙ বা ডিজাইন বদলালেই সম্মান ফেরে না। সম্মান ফেরে তখনই, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে মর্যাদা দেয়, আর বিশ্ব সেই মর্যাদায় আস্থা রাখে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই আস্থা ফেরানোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারছি?
Comments