নির্বাচনের প্রাক্কালে আইনশৃঙ্খলা সংকট
পাঁচ সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের মতপ্রকাশের প্রধান উপায়।
কিন্তু নির্বাচনের আগমুহূর্তে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে,তাতে সুষ্ঠু,শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং জেল পলাতক অপরাধীদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
গত সোমবার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের তিন জেলায় তিনটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দেয়। যশোরের মনিরামপুরে একজন ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামের রাউজানে একজন রাজনৈতিক নেতাকে মাথায় গুলি করে খুন করা হয় এবং নরসিংদীতে আরেক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ধারাবাহিকতা। নতুন বছরের প্রথম ছয় দিনেই আটটি খুন, যার মধ্যে পাঁচটিই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে -এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, সহিংসতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়,বরং উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের সহিংসতা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলছে। সম্ভাব্য প্রার্থী, রাজনৈতিক কর্মী এমনকি ভোটারদের মধ্যেও ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। নির্বাচনকালীন সহিংসতার আশঙ্কা নতুন নয়, কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং আরও জটিল। কারণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল,যার বড় অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী,পাঁচ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র ও ছয় লাখের বেশি গোলাবারুদ লুট হয়, যার মধ্যে রয়েছে চাইনিজ রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি এবং অত্যাধুনিক পিস্তল। এসব অস্ত্র অপরাধীচক্রের হাতে থাকা মানেই নির্বাচনী পরিবেশের ওপর স্থায়ী হুমকি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের উপস্থিতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী অস্থিরতায় হাজার হাজার বন্দি পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে এখনও ৭১০ জন ধরা পড়েনি। এদের অনেকেই পেশাদার অপরাধী বা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত বা অভিযুক্ত। তারা মুক্ত অবস্থায় থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে অপরাধ দমনে পুলিশের ওপর চাপ বাড়ছে, অথচ পুলিশের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে তিন হাজার ৫০৯ জন খুন হয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল অপরাধের মাত্রাই নয়,বরং সামাজিক নিরাপত্তার সংকটকেও নির্দেশ করে। যখন মানুষের জীবন নিরাপদ নয়, তখন নির্বাচন নিয়ে আস্থা তৈরি করা কঠিন। ভোটাররা যদি কেন্দ্রে যেতে ভয় পান, তবে ভোটের ফলাফল যতই আইনগতভাবে বৈধ হোক না কেন, তা নৈতিক বৈধতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
এই পরিস্থিতির দায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা,রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির ঘাটতিও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি, অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং বিচারহীনতার প্রবণতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে অপরাধ দমন সম্ভব নয়।
তবে এখনো সময় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। নির্বাচনের আগে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত,অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান জোরদার করতে হবে এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে 'শূন্য সহনশীলতা' নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত,পলাতক বন্দিদের গ্রেপ্তারে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচনী এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান ও কার্যকর করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস রাজনীতি পরিহার করা এবং কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাই যথেষ্ট হবে না। গণতন্ত্রের স্বার্থে সব পক্ষকে সংযম ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার বন্ধন নবায়নের সুযোগ। সেই সুযোগ যদি ভয়, রক্তপাত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়, তবে ক্ষতি হবে পুরো জাতির। তাই এখনই সময় আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করার।
Comments