চাঁদপুরের কচুয়া সরকারি কলেজ যেন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য!
চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ এখন নিয়মনীতিহীন এক অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। লাইব্রেরির বই কেনা থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ, কেনাকাটা এবং শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের টাকা, সবখানেই চলছে হরিলুট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক এক তদন্তে কলেজটির কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এই ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে এসেছে।
সোমবার (৮ জুন, ২০২৬) ডিআইএ তদন্ত প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছে।
ডিআইএর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অভিনব সব জালিয়াতির তথ্য। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লাইব্রেরির জন্য ১ হাজার ১৩৭টি বই কেনা বাবদ ২ লাখ ৮১ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে লাইব্রেরিতে একটি বইয়েরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি! বর্তমান অধ্যক্ষও ডিআইএকে নিশ্চিত করেছেন যে এই বইগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। অর্থাৎ, বই না কিনেই পুরো টাকা পকেটে ভরা হয়েছে।
একইভাবে দুটি মোটর পাম্প কেনার নামে ২৮ হাজার টাকা খরচ দেখানো হলেও মিলেছে মাত্র একটি। আর ২৮ হাজার টাকায় দুটি ফোন কেনার বিল তোলা হলেও বাস্তবে কোনো ফোনই খুঁজে পায়নি তদন্ত দল। এমনকি দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকলেও 'ছাত্র সংসদ' খাতে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
কলেজটির সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ঘটেছে শিক্ষক নিয়োগে। প্রতিষ্ঠানের মোট ৪০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে ২২ জনের নিয়োগেই গুরুতর জালিয়াতি ও আপত্তি তুলেছে ডিআইএ।
২০১৮ সালে কলেজটি সরকারিকরণের পর থেকে তারা অবৈধভাবে রাজস্ব তহবিল থেকে বেতন-ভাতা তুলছেন। তদন্ত সংস্থা এই ২২ জন শিক্ষকের বেতন-ভাতা অবিলম্বে বন্ধ করার এবং এ পর্যন্ত তাদের নেওয়া ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার জোর সুপারিশ করেছে।
২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এইচএসসি ও স্নাতক পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড বিতরণের নামে নিয়ম বহির্ভূতভাবে জনপ্রতি ৮৫০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা বোর্ডের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই ৬ হাজার ১০৪ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে এভাবে ৫১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার কোনো বৈধ হিসাব নেই। এই টাকা আত্মসাতের জন্য তৎকালীন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, সরকারি নিয়মকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের পকেট ভরাতে ব্যস্ত ছিলেন শিক্ষকরা। শিক্ষক পরিষদের সভায় উপস্থিতির জন্য শিক্ষকরা বিধিবহির্ভূতভাবে ৪ লাখ ৭১ হাজার টাকা সম্মানী নিয়েছেন। আপ্যায়ন বাবদ অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। লাইব্রেরি খাত থেকে অবৈধভাবে ৫০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের নামে ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা সম্মানী হিসেবে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। গভর্নিং বডির সদস্যরাও সভা করার নামে হাতিয়েছেন কয়েক লাখ টাকা। এমনকি করোনাকালের 'অটো পাস' পরীক্ষার্থীদের অব্যয়িত ১৮ হাজার টাকাও শিক্ষকরা সম্মানী হিসেবে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিয়েছেন!
কলেজের নিজস্ব অনলাইন ব্যবস্থা থাকার পরও বাইরের বাণিজ্যিক দোকান থেকে ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা খরচ করে অনলাইন কাজ করানো হয়েছে। কলেজের নিজস্ব ফটোকপি মেশিন থাকা সত্ত্বেও বাইরের দোকান থেকে লাখ টাকার ফটোকপি করার বিল তোলা হয়েছে। এছাড়া সরকারি রাজস্ব বাজেটের বিধি বহির্ভূতভাবে ব্যয়িত ৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মহা-অনিয়মের বিষয়ে জানতে কচুয়া সরকারি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, 'তদন্ত প্রতিবেদনটি সমস্ত প্রমাণসহ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় আইন অনুযায়ী পরবর্তী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে'। ঐতিহ্যবাহী একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন বেহাল দশা এবং হরিলুটের ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। তারা দ্রুত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
Comments