সিডিএকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাস্তহারা-খেতচরে দোতলা-তিনতলা স্থাপনা
চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানাধীন বাস্তহারা-খেতচরে সরকারি খাসজমি ও কর্ণফুলীর তীরবর্তী নিচু ভূমি ভরাট করে একের পর এক দোতলা-তিনতলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। নোমান কলেজ রোডের দুইতলা মসজিদসংলগ্ন এলাকা, খেতচর এবং ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর গলিতে একসময় নিচু জমি ও জলপ্রবাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত জায়গায় এখন পাকা ভবন, দোকানপাট, রাস্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কোথাও গড়ে উঠেছে জুট ও প্লাস্টিকের কারখানা।
সরেজমিনে দেখা গেছে,অস্থায়ী বসতি ও টিনশেড ঘরের জায়গা বদলে গেছে পাকা স্থাপনায়।কর্ণফুলীর ড্রেজিংয়ের মাটি, বালু, পলিথিন ও বর্জ্য ফেলে নিচু জায়গা উঁচু করার পর সেখানে প্রথমে বসতি ও দোকান গড়ে ওঠে। পরে রাস্তা তৈরি করে দখল ও বসতি সম্প্রসারণ করা হয়। সেই জমিতেই এখন উঠেছে দোতলা-তিনতলা ভবন।
অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নজরদারি নিয়ে।নগরের অন্য এলাকায় একটি ভবন নির্মাণে নকশা, ভূমির ব্যবহার ও নির্মাণবিধি নিয়ে কড়াকড়ি থাকলেও বাস্তহারা-খেতচরে খাসজমি ও ভরাট ভূমিতে একের পর এক স্থাপনা কীভাবে দাঁড়িয়ে গেল—তার জবাব চায় নগরবাসী। নির্মাণের আগে জমির শ্রেণি যাচাই হয়েছিল কি না, ভবনের নকশা অনুমোদিত কি না, অনুমোদন না থাকলে নির্মাণ বন্ধ করা হয়নি কেন এবং কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকলে তার ভিত্তি কী এসব প্রশ্ন এখন সরাসরি সিডিএর সামনে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী নিচু ভূমি ভরাট বা উঁচু করা এবং নদী, খাল, বিল, জলাশয় বা প্রাকৃতিক জলাধারের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
দখল ও জমি বেচাকেনার অভিযোগের সঙ্গে সামনে এসেছে 'বাকলিয়া বাস্তহারা সমবায় সমিতি লিমিটেড' এর নাম। অভিযোগ উঠেছে, সমিতির নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বসতি স্থাপন ও জমি হস্তান্তরের ব্যবস্থা চলে আসছে। সরকারি খাসজমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে।
সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,সমিতির লোকজন সরকারি খাস জায়গা বিক্রি করে কোটিপতি হচ্ছে। তাদের বাড়ি এখন দোতলা-তিনতলা। সমিতির নামে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। চাঁদা না দিলে বস্তিবাসীর ওপর জুলুম-নির্যাতন করা হয়েছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে।'
অভিযোগ রয়েছে খাসজমির কোনো কোনো অংশ নিজেদের মালিকানাধীন দেখাতে জাল কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমেও দখল করা হয়েছে। কোথাও বালু মজুত ও বালু ব্যবসার কার্যক্রমও চলছে।
এই দখল প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সময়ে সমিতির নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের নামও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। বর্তমান সভাপতি মো. ফারুক, সাবেক সভাপতি উত্তম কুমার সুশীল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন ও মাছ সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী এবং ৩৫ নম্বর বক্সিরহাট ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে এসব কর্মকাণ্ড চলত বলেও অভিযোগ রয়েছে।নগর যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রুবু সহযোগিতা করতেন তাদের।
তথ্য অনুযায়ী , এই দখল প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন আলোচিত নাম জসিম উদ্দিন ওরফে বার্মা জসিম। ২০০০ সালে সীতাকুণ্ডের সলিমপুর এলাকা থেকে ফিশারিঘাটে এসে মাছের নৌকায় কুলি ও নৌকা মেরামতের কাজ করতেন তিনি। পরে ২০০৫ সালে বাকলিয়া বাস্তহারা এলাকায় আসেন। ২০০৬ সালে বাস্তহারা সমবায় সমিতির নেতৃত্বে আসার পর তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে। সরকারি খাসজমিতে বসতি ও জমি হস্তান্তর ঘিরে তাঁর অনুসারীদের তৎপরতাও বাড়ে আস্তে আস্তে। ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর একসময় এলাকা ছাড়লেও তাঁর অনুসারীরা দখলের নেতৃত্বে দেন।বর্তমানে দখল প্রক্রিয়ায় নতুন করে সমিতির নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী মহলের নাম সামনে আসছে।
স্থানীয় এক কাউন্সিলর পদপ্রার্থী বলেন, 'বাস্তহারা আওয়ামী লীগের আস্তানা ছিল, এখনো আছে। সেখান থেকে মিটিং-মিছিল হয়। ছাত্রলীগ-যুবলীগের আড্ডাখানা ছিল এটি। মাদক, জুয়া ও পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এখন তারা দোতলা-তিনতলা ভবন করছে। সিডিএর আইন তাদের লাগে না। নতুন ব্রিজ থেকে খেতচর পর্যন্ত জায়গা দখল করে খাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'সমিতির সভাপতি ফারুক, সাবেক সভাপতি উত্তম কুমার, সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন, মাছ সালাউদ্দিনসহ বার্মা জসিমের নেতৃত্বে একটি চক্র এসব নিয়ন্ত্রণ করছে।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিএনপি নেতা বলেন, তারা আওয়ামী লীগের আমলে খেয়েছে, এখনো খাচ্ছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করার জায়গায় শেল্টার দিচ্ছে। সরকারি তালিকায় এসব ভূমিদস্যুদের নাম থাকার পরও কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। তারা আমাদের ওপর উল্টো জুলুম-নির্যাতন করে।তারা আওয়ামী লীগের আমলে লুটেপুটে খেয়েছে। এখনো প্রভাব ধরে রেখেছে। আমাদের ওপর উল্টো জুলুম-নির্যাতন করে।'
ভরাট জমিতে নির্মিত ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে বড় শঙ্কা। কোনো কোনো স্থাপনার নিচে পলিথিন, বর্জ্য ও নরম মাটি রয়েছে। জলপ্রবাহের জায়গা বা খাল ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়ে থাকলে মাটির ভার বহনক্ষমতা, ভিত্তির গভীরতা ও কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা জরুরি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চলে হওয়ায় দুর্বল ভরাট জমির ওপর ত্রুটিপূর্ণ ভবন বড় ধরনের জননিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এলাকায় জুট ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন কারখানা গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জমির ব্যবহার,পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নদী বা খালে বর্জ্য যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বাস্তহারা-খেতচরের এই চিত্র কর্ণফুলীর সামগ্রিক দখল-দূষণ পরিস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত। চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের দাবি, ২০১৪ সালে শাহ আমানত সেতুর নিচে কর্ণফুলীর প্রস্থ ছিল প্রায় ৮৬৬ মিটার। বর্তমানে তা প্রায় ৪১০ মিটারে নেমে এসেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ে নদীর জায়গা দখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।
কর্ণফুলীর দখল ও দূষণ নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ৮ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কর্ণফুলী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন খাল দিয়ে কলকারখানার বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ছে। এতে নদীর তলদেশ ভরাট, নাব্যতা হ্রাস ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে।
চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান বলেন,'ফিরিঙ্গিবাজার থেকে নতুন ব্রিজ পর্যন্ত নদীর তীরের বিভিন্ন অংশে নতুন স্থাপনা গড়ে উঠছে। উচ্ছেদ করা জায়গায় স্থায়ী নজরদারি না থাকায় পুনর্দখলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, উদ্ধার করা জায়গার সীমানা নির্ধারণ করে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।'
সরকারি হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, 'দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা একই সঙ্গে কর্ণফুলীর সংকট বাড়াচ্ছে। দ্রুত দখল উচ্ছেদ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কর্ণফুলীর দখল ও দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। নদী রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
সরকারি খাসজমি দখল, নদীর তীর ভরাট কিংবা অনুমোদনহীন স্থাপনার প্রমাণ মিললে শুধু স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না এতদিন এসব নির্মাণ কীভাবে চলল, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি দখলমুক্ত এবং পুনর্দখল ঠেকাতে স্থায়ী নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে বলে জানায় নগরবাসী।
Comments