বিপিসি'র ৫০ কোটি টাকার ভবনে ফাটল, তড়িঘড়ি করে সংস্কার!
উদ্বোধনের আগেই বড় ধরনের বিতর্কের মুখে পড়েছে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সঞ্চয় ও বিপণনের একমাত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) নবনির্মিত প্রধান কার্যালয় ভবন।
চট্টগ্রাম নগরীর কেন্দ্রস্থল জামালখান সংলগ্ন জয় পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বহুতল ভবনটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাড়া বাড়িতে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার গ্লানি মুছে নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানায় ওঠার আনন্দে যেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে এই ফাটল কাণ্ড বিপিসি কর্তৃপক্ষের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। জমকালো আয়োজনে উদ্বোধনের ঠিক আগমুহূর্তে ভবনের এই জরাজীর্ণ দশা ধামাচাপা দিতে রাতের আঁধারে এবং অত্যন্ত গোপনে তড়িঘড়ি করে পুটিং ও রঙের প্রলেপ দিয়ে সংস্কার কাজ চালানোর অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়ার গুণগত মান ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে চট্টগ্রাম নগরীর জয় পাহাড়ে অবস্থিত বিপিসি'র নবনির্মিত সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রঙের কাজ, বৈদ্যুতিক সংযোগ, কাঁচের ফিটিংস এবং আধুনিক পাইপ লাইনের সব ধরনের ফিনিশিং কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। দূর থেকে ভবনটিকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত মনে হলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ালে ও অংশে দৃশ্যমান ফাটল ধরেছে। কোনো কোনো স্থানে ফাটলটি এতই চওড়া যে প্লাস্টারের আস্তর খসে পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাইটে কর্মরত একাধিক নির্মাণ শ্রমিক জানান, গত কয়েক সপ্তাহে এই ফাটলগুলো তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে বিপিসি'র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে ফাটলগুলো লুকানোর মিশন শুরু করে। এক শ্রমিক বলেন, স্যাররা এসে দেখে যাওয়ার পর আমাদের বলা হয়েছে জলদি কাজ শেষ করতে। ফাটলগুলো ঢাকা দিতে এখন দিন-রাত তড়িঘড়ি করে কেমিক্যাল পুটিং ও সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে এবং তার ওপর পুনরায় চুনকাম ও রঙের কাজ চালানো হচ্ছে, যাতে বাইরে থেকে কেউ কিছু বুঝতে না পারে।
ভবনের এই ভয়াবহ ফাটল ও তড়িঘড়ি মেরামতের বিষয়ে বিপিসি'র নতুন সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও সংস্থাটির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আপেল মামুন বলেন, এগুলো বড় ধরনের ফাটল নয়। নির্মাণকাজের সময় ছোটখাটো ফাটল দেখা দিতেই পারে। পুটিং ও প্লাস্টার করে সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে। ভবনের নির্মাণসামগ্রী ও কাজের মান নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।
প্রকল্পের সহযোগী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেডের সাইট ইঞ্জিনিয়ার আরমান বলেন, ভবনের দেয়ালের কয়েকটি অংশে ফাটল দৃশ্যমান হওয়ার পর দ্রুতগতিতে সেগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর তাই নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে, এই নির্মাণকাজের মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান 'ইউনাইটেড কর্পোরেশন' এর সাইট ইঞ্জিনিয়ার তানভীর বিষয়টিকে স্বাভাবিক দাবি করে বলেন, এটি বড় কোনো ত্রুটি নয়, বরং এটি একটি সাধারণ 'টেকনিক্যাল ফল্ট'।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্প পরিচালকের এই 'সাধারণ ত্রুটি'র দাবিকে সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেছেন সিভিল ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে জয় পাহাড়ের মতো একটি সংবেদনশীল পাহাড়ি ঢালু এবং ক্ষয়িষ্ণু সয়েল প্রোফাইলের ওপর ৫০ কোটি টাকার ভবন নির্মাণের আগে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় আবাসন ও ভূ-তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা জানান, পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালু জমিতে এত বড় ভারী অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিখুঁত 'সয়েল টেস্ট' (মাটি পরীক্ষা), পাইল লোড টেস্ট এবং শক্তিশালী 'রিটেইনিং ওয়াল' নির্মাণ করা বাধ্যতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এটি ফাউন্ডেশনের ত্রুটি বা মাটি দেবে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে, তবে পুডিং দিয়ে ফাটল ঢাকা চরম আত্মঘাতী হবে। বর্ষাকালে যখন পাহাড়ি মাটি ভারী হয়ে যাবে, তখন এই ভবনটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। এতে শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবন এবং রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জ্বালানি খাতের নথিপত্র সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বিপিসি'র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হওয়া নিয়ে এখন আনন্দের চেয়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসি'র এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন ভবনে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে ছিলাম। কিন্তু এখন শুনছি ভবন চালুর আগেই ফাটল ধরেছে এবং তা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। এই ভবনে ঢুকে যদি আমাদের জীবনের ঝুঁকিতে পড়তে হয়, তবে এই নিজস্ব ভবনের কী মূল্য আছে? সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বুয়েট বা চুয়েট -এর প্রকৌশলীদের দিয়ে এই ভবনের ফিটনেস সার্টিফিকেট যাচাই করা।
বিপিসি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড। এই ভবনে বসেই দেশের আন্তর্জাতিক তেল আমদানি, শোধনাগার নিয়ন্ত্রণ ও কোটি কোটি ডলারের চুক্তি সম্পাদিত হবে। ফলে এই ভবনের নিরাপত্তা কেবল একটি আবাসন সংকট নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। অবিলম্বে এই ফাটলের রহস্য উদঘাটন, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ টিম দ্বারা ভবনের স্ট্রাকচারাল অডিট সম্পন্ন করা এবং দোষী ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ভবনটি উদ্বোধন করা হলে তা দেশের ইতিহাসে আরেকটি বড় মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
Comments