খরচ কমানো নয়, খরচের দক্ষতাই টেকসই ব্যবসা বৃদ্ধির চাবিকাঠি
ব্যবসা পরিচালনায় খরচ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খরচ কমানোর নামে কর্মীদের সুবিধা কমানো, অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা বা তাদের প্রকৃত অবদানকে মূল্যায়ন না করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পরিবর্তে বাধা তৈরি করতে পারে। টেকসই ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন শুধু cost cutting নয়; প্রয়োজন cost efficiency—অর্থাৎ সঠিক জায়গায় ব্যয় করে সর্বোচ্চ দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও ফলাফল নিশ্চিত করা।
একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য: কার্যকর প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ ভিশন ও লক্ষ্য, এবং কর্মীবান্ধব কর্মসংস্কৃতি। কর্মীরা যখন প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বোঝেন, ন্যায্য মূল্যায়ন পান এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপদ বোধ করেন, তখন তাদের সম্পৃক্ততা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে। বিপরীতে, কর্মীদের সুবিধা কমিয়ে দেওয়া বা তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য না দিলে তারা বিকল্প সুযোগ খুঁজতে শুরু করতে পারেন।
বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় যৌথ মালিকানাধীন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় 'Project One Cent' নামে একটি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি, একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অপচয় কমানো, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মীদের সুবিধা উন্নয়নের মাধ্যমে সামগ্রিক ব্যবসায়িক সুফল অর্জন করতে পারে। কর্মীদের সুবিধা বাড়ানোকে সেখানে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো ধারণা রয়েছে—কর্মীদের খরচ কমানো এবং তাদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করলেই প্রতিষ্ঠান বেশি সাশ্রয় করবে। স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক সাশ্রয় দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফল হতে পারে কর্মীদের অনুপ্রেরণা হ্রাস, কর্মী পরিবর্তনের হার বৃদ্ধি, সেবার মান কমে যাওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট।
একজন কর্মী যদি মনে করেন যে তাঁর শ্রম, দক্ষতা ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না, তাহলে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত থাকতে পারবেন না। কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত থাকা আর সর্বোচ্চ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা দিয়ে কাজ করা এক বিষয় নয়। কর্মীদের সম্পৃক্ততা, নিরাপত্তা, সম্মান এবং উন্নয়নের সুযোগ সরাসরি কাজের মানকে প্রভাবিত করে।
তাই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত 'কম খরচ' নয়, 'সঠিক খরচ'। কোন প্রক্রিয়ায় অপচয় হচ্ছে, কোথায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে সময় ও শ্রম সাশ্রয় করা যায়, কীভাবে পুনরাবৃত্ত কাজ কমানো যায় এবং কর্মীদের দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কর্মীদের সুবিধা কমানোর আগে প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ প্রক্রিয়া, অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, দুর্বল পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাগত অপচয় চিহ্নিত করা জরুরি।
একটি টেকসই প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে না; বরং তাদের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। ন্যায্য বেতন, যথাযথ সুবিধা, প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ যোগাযোগ, কর্মজীবনের ভারসাম্য এবং সম্মানজনক আচরণ কর্মীদের ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা ধরে রাখতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ায়।
সর্বোপরি, ব্যবসায়িক উন্নয়নের জন্য cost minimization-এর পরিবর্তে cost efficiency-কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুসংগঠিত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ লক্ষ্য, সঠিক নেতৃত্ব এবং কর্মীবান্ধব সংস্কৃতি একসঙ্গে কাজ করলেই টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব। কর্মীদের মূল্য কমিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকতে পারে না; বরং কর্মীদের সক্ষমতা বাড়িয়ে, প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করেই প্রকৃত সাশ্রয় ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
লেখক: গ্রাহক অভিজ্ঞতা বিশেষজ্ঞ
Comments