এ আই দিয়ে আশি বা নব্বই দশকের স্মৃতির পেছনে পরিবেশের ক্ষতি, তথ্য চুরি ও ইতিহাস বিকৃতির ভয়াবহ চিত্র
ফেসবুক খুললেই আজকাল চোখ আটকে যায় আশির বা নব্বইয়ের দশকের রূপ নিয়ে তৈরি রকমারি ছবিতে। কেউ নিজের বর্তমান চেহারাকে আশির দশকের সিনেমার নায়কের মতো বানাচ্ছেন, কেউ বা গ্রামবাংলার পুরনো মেলা কিংবা শৈশবের ছবি তৈরি করছেন খুব সহজে। কোনো ক্যামেরা নেই, ফিল্ম রিল নেই, আলো-ছায়া বোঝার দরকার নেই—মোবাইলে শুধু কয়েকটা শব্দ লিখে দিলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে নিখুঁত সব পুরানো দিনের দৃশ্য। নিছক বিনোদন কিংবা অতীতকে একটুখানি ছুয়ে দেখার এই ইচ্ছা আপাতদৃষ্টিতে বেশ নিষ্পাপ মনে হয়। কিন্তু স্ক্রিনের ওপারে যে কম্পিউটার সার্ভারগুলো এই ছবি তৈরি করে দিচ্ছে, সেগুলোর পেছনের পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি, তীব্র বিদ্যুৎ সংকট, গোপন বায়োমেট্রিক তথ্য চুরি এবং ইতিহাসের সত্য বিকৃতির হিসাব নিলে দেখা যাবে—আমরা কত বড় ক্ষতি ডেকে আনছি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোনো বাতাসের ওপর ভর করে কাজ করে না। এই প্রযুক্তিকে সচল রাখে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল কম্পিউটার ঘর বা ডেটা সেন্টার। সাধারণ ইন্টারনেটে একটি শব্দ খোঁজার চেয়ে এআই দিয়ে একটি ছবি বা ভিডিও তৈরি করতে কম্পিউটার প্রসেসরকে হাজার গুণ বেশি শক্তিতে কাজ করতে হয়। গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউগুলো যখন দিনরাত অতিরিক্ত গতিতে চলে, তখন সার্ভার রুমের তাপমাত্রা ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যায়। এসব প্রসেসরকে মাত্রাতিরিক্ত গরম হয়ে অকেজো হওয়া থেকে বাঁচাতে ব্যবহার করতে হয় সুপেয় পানির বিশেষ কুলিং ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এআই দিয়ে মাঝারি মানের মাত্র একটি ছবি তৈরি করতে গিয়ে প্রসেসিং ও তার বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরোক্ষ প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৯ মিলিলিটার বিশুদ্ধ পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। সাধারণ হিসাবে দুই টেবিল-চামচ পানি খুব সামান্য মনে হলেও যখন প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩০ কোটি এআই ছবি তৈরি হয়, তখন পানির পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। নিছক শখের বশে তৈরি হওয়া ছবিগুলোর কারণে নদী ও ভূগর্ভের এই পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর ছবি বানানোর বদলে যদি ১০-১২ সেকেন্ডের একটি রঙিন এআই ভিডিও বানানো হয়, তবে পানি অপচয়ের পরিমাণ ছবি প্রতি ৪ লিটার ছাড়িয়ে যায়।
এই অপচয়ের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশে। ভারতের বেঙ্গালুরু শহরের কথা ধরা যাক। শহরটিতে দীর্ঘদিন ধরে খাওয়ার পানির তীব্র কষ্ট চলছে, সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে হয়। অথচ টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফার্স্টপোস্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অবাক করা তথ্য। ওই একই বেঙ্গালুরু শহরে চালু থাকা ৩১টি আন্তর্জাতিক ডেটা সেন্টার প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি লিটার মাটির নিচের বিশুদ্ধ পানি টেনে নিচ্ছে কেবল তাদের প্রসেসর ঠান্ডা রাখতে। ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি মাঝারি ডেটা সেন্টারের প্রতিদিন অন্তত সাড়ে ৬৮ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন পড়ে। ভারতের উত্তর প্রদেশের নয়েডা এলাকায় মাটির নিচ থেকে পানি তোলার হার এখন ১০৪ শতাংশের বেশি, যার অর্থ প্রাকৃতিকভাবে যে পরিমাণ পানি বৃষ্টি বা নদীর মাধ্যমে নিচে জমা হয়, এআই প্রযুক্তির পেছনে তুলে নেওয়া হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এটি চরম উদ্বেগের বিষয়। ঢাকা ও তার আশেপাশে খাওয়ার পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই কঠিন সময়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডেটা সেন্টারের বিস্তার এবং এআই প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার দেশের বিদ্যুৎ ও ভূগর্ভস্থ পানির মজুদের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করছে।
পানির পাশাপাশি নষ্ট করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ শক্তি। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএ-র জ্বালানি পূর্বাভাসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সারাবিশ্বের এআই ও ক্লাউড ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদা বছরে ৫০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা ছাড়িয়ে গেছে, যা খুব দ্রুত প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে। এই শক্তির পরিমাণ জার্মানি বা জাপানের মতো উন্নত ও বিশাল শিল্পোন্নত দেশের এক বছরের মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রায় সমান। আমরা যখন কয়েক সেকেন্ডের আমোদে একটা ছবি বানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি, তখন আসলে কয়লা ও গ্যাস জ্বালিয়ে তৈরি করা বিদ্যুৎ অপ্রয়োজনে নষ্ট করি, যা সরাসরি বাতাসে বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। শুধু তা-ই নয়, প্রসেসিং ক্ষমতা ধরে রাখতে ২-৩ বছর পরপর ডেটা সেন্টারের প্রসেসর ও মাদারবোর্ড পুরোনো হয়ে অকেজো হয়ে পড়ে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির তথ্য মতে, এআই অবকাঠামো আধুনিকায়নের এই গতির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর সারা বিশ্বে অতিরিক্ত ২৫ লাখ টন বিষাক্ত ইলেকট্রনিক বর্জ্য জমবে, যার সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়াম আমাদের মাটি ও সুপেয় পানির সঙ্গে মিশে মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।
পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির জগতেও এটি নিঃশব্দে এক আর্থিক ক্ষতি ও ধ্বংস ডেকে এনেছে। আশির বা নব্বইয়ের দশকের যে বাস্তব ছবিগুলো এআই আমাদের তৈরি করে দেয়, সেগুলো কোনো কম্পিউটার একা একা বা শূন্য থেকে আঁকতে পারে না। আশির ও নব্বইয়ের দশকে যে আলোকচিত্রীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে আসল ইতিহাস ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন, তাদের তোলা লাখ লাখ ছবি কোনো অনুমতি ছাড়া ইন্টারনেট থেকে চুরি করে এআই মডেলগুলোকে প্রসেস করা শেখানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা গেটি ইমেজেস ইতোমধ্যে আদালতে প্রমাণসহ আন্তর্জাতিক মামলা দায়ের করেছে যে, এআই কোম্পানিগুলো তাদের সংগ্রহ থেকে ১২ মিলিয়নেরও বেশি সংরক্ষিত ছবি ও ঐতিহাসিক তথ্য অবৈধভাবে ব্যবহার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি কার্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি আসার পর থেকে আসল আলোকচিত্রী, চিত্রশিল্পী ও ডিজাইন শিল্পীদের রুজি-রোটি এবং কাজের সুযোগ বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৫ শতাংশ কমে গেছে। অন্যের সৃষ্টি চুরি করে এআই আজ তাদের জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় ফাঁদটি পাতা রয়েছে সাইবার অপরাধের দুনিয়ায়। আশির দশকের রূপে নিজেকে কেমন দেখায়—তা দেখার কৌতুহলে সাধারণ মানুষ গুগল প্লে-স্টোর বা ওয়েবসাইটের বিভিন্ন অচেনা অ্যাপে নিজেদের ও পরিবারের একাধিক ছবি আপলোড করছেন। সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ক্যাসপারস্কি এবং ব্রিটিশ প্রযুক্তি ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় ধরা পড়েছে, এসব ফ্রি এআই অ্যাপের অন্তত ১২ শতাংশ অ্যাপ গোপনে ব্যবহারকারীর মুখের ত্রিমাত্রিক শারীরিক গঠন (Face-ID Structure) নিজেদের সার্ভারে জমা করে রাখে। পরবর্তীকালে এই গোপন বায়োমেট্রিক তথ্য বিক্রি হয়ে যায় কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক, কৃত্রিম ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে মানুষের চরিত্র হরণ এবং ভুয়ো পরিচয় তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ আপনার অজান্তেই আপনার ও পরিবারের মুখচ্ছবি অন্য কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধী বা স্ক্যামার চক্রের হাতে চলে যাচ্ছে।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এআই ছবি মানুষকে এক ধরনের কৃত্রিম বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গবেষকেরা একে বলছেন 'মিথ্যা স্মৃতি রোগ' বা ফলস মেমোরি সিন্ড্রোম। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক যদি কোনো কাল্পনিক কিন্তু নিখুঁত ছবি বারবার দেখে, তবে একসময় সেটিকে বাস্তব অতীত বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। আশির বা নব্বইয়ের দশকের আসল বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনে যে আর্থিক টানাপোড়েন, পুরনো ছবির রুক্ষতা, দারিদ্র্য, মহামারী ও সংগ্রামের রূপ ছিল—এআই সেটিকে একটি অতিরিক্ত চকচকে, মসৃণ ও আধুনিক সাজে উপস্থাপন করে। ফলে নতুন প্রজন্ম তৎকালীন বাস্তব ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি কৃত্রিম ও রঙিন কাল্পনিক অতীতকে সত্য বলে ধরে নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আসল ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমাজ থেকে চিরতরে মুছে দেওয়ার সামিল।
এই প্রযুক্তিগত উন্মাদনা ও অদৃশ্য ক্ষতি থেকে বাঁচতে অবিলম্বে কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ব্যক্তিগত পর্যায়ে বুঝতে হবে যে নিছক বিনোদনের জন্য অনবরত ছবি বা ভিডিও তৈরি করার অভ্যাস বন্ধ করা উচিত। ইন্টারনেটে ছবিটি কয়েকদিনের মধ্যে হারিয়ে যাবে, কিন্তু যে সুপেয় পানি ও বিদ্যুৎ শক্তি নষ্ট হলো তা আর কখনো প্রকৃতিতে ফিরবে না। দ্বিতীয়ত, সরকার ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এআই দ্বারা তৈরি প্রতিটি ছবিতে আন্তর্জাতিক সি২পিএ (C2PA) নিয়মে বিশেষ দৃশ্যমান চিহ্ন থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন ইতিহাস বিকৃতি ও ভুয়ো ছবি চেনা সহজ হয়। পাশাপাশি, অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল অ্যাপে নিজের বা সন্তানের আসল ছবি আপলোড করার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করতে হবে এবং ডেটা সেন্টারগুলোকে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির বদলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানি ও সৌর বিদ্যুতে চালনার বাধ্যতামূলক আইনি নিয়মে আনতে হবে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য, কিন্তু সেই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যদি আমাদের সুপেয় পানি, সুস্থ পরিবেশ ও ঐতিহাসিক সত্যকেই গিলে খায়, তবে সেই ডিজিটাল উন্নতি আদতে এক ক্ষতিকর পথ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক ও পরিকাঠামোগত উপাত্তসমূহ সংগ্রহ করা হয়েছে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাময়িকী 'সেল রিপোর্টস সাসটেইনেবিলিটি'-তে প্রকাশিত পরিবেশ গবেষণা নিবন্ধ, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) বৈশ্বিক জ্বালানি সংক্রান্ত মূল্যায়ন এবং জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রিপোর্ট থেকে। এ ছাড়া ডেটা সেন্টারের পানির সংকট সংক্রান্ত তথ্যচিত্রসমূহ ভারতের 'সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ড' এবং সংবাদপত্র 'দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া' ও 'ফার্স্টপোস্ট'-এর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন নির্ভর। আলোকচিত্রীদের মেধা স্বত্ব ও সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত প্রদেয় তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক ফটো সংস্থা গেটি ইমেজেসের আইনগত নথি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি কার্যালয়ের সমীক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির প্রযুক্তিগত রিপোর্ট এবং 'সাইকোলজিক্যাল সাইন্স' জার্নালের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উপস্থাপিত।
Comments