বাজেট ২০২৬-২৭: ডিজিটাল কমার্সে বড় প্রাপ্তি, বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
১১ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, তা আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। তবে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় গুরুত্বের জায়গাটি হলো দেশের আইটি, ডিজিটাল কমার্স এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম। এই খাতের জন্য বাজেটে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা এই খাতের পুরো চেহারাটাই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। গত ৩০ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে এই বাজেটটি চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার মাধ্যমে সেই রূপান্তর এখন আনুষ্ঠানিক আইনি রূপ লাভ করেছে।
প্রকৃতপক্ষে, পাস হওয়া এই বাজেটে বাংলাদেশ সরকারের *"সাবার আগে বাংলাদেশ"* নীতির এক সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন দেখা গেছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি স্বনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক 'স্মার্ট ইকোনমি' বিনির্মাণ করাই যে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি, তা এই বাজেটের প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট। সরকার এবার বুঝিয়ে দিয়েছে যে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে প্রথাগত রাজস্ব আদায়ের মডেলের চেয়ে দেশীয় লজিস্টিকস আধুনিকায়ন এবং তৃণমূলের উদ্যোক্তা উন্নয়ন অনেক বেশি জরুরি। সরকারের এই প্রগতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী কর কাঠামোর রূপরেখা সরাসরি আমাদের বর্তমান গবেষণা, জনমত গঠন ও পলিসি অ্যাডভোকেসি ভূমিকার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে।
আজকের দিনে ই-ক্যাব (e-CAB)-এর ৩ হাজারেরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সদস্য এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫ লাখের অধিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাজেটটি অত্যন্ত জীবনমুখী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিশাল উদ্যোক্তা সমাজ কিন্তু আজ দেশের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস, সরবরাহ চেইন এবং তৃণমূলের কর্মসংস্থানের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। এই প্রেক্ষাপটেই গবেষণা সংস্থা *সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স Research অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (DCRAF)* এবং খাতের অংশীজনদের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণী মহলে বিভিন্ন দাবি ও সংস্কারের কথা বলে আসছিলাম, যার একটি বড় প্রতিফলন এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে স্পষ্ট দেখা গেছে।
আমাদের ৩০ দফার মাস্টার প্ল্যান এবং বাজেটে ঐতিহাসিক প্রতিফলন
এই বাজেটটি আমাদের জন্য কেবল সরকারের একটি বার্ষিক হিসাবনিকাশ নয়, বরং এটি আমাদের দীর্ঘদিনের যৌথ প্রচেষ্টার একটি বড় বিজয়। আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে আমরা যে ৩০ দফার একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান ও সংস্কার দাবি তুলে ধরেছিলাম, এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রায় ৭০ শতাংশেরই সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে।
ক্ষুদ্র অনলাইন উদ্যোক্তাদের প্রতি মাসের ভ্যাট রিটার্নের শ্বাসরুদ্ধকর গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি দেওয়া, ই-কমার্সকে একটি স্বাধীন শিল্পের মর্যাদা দেওয়া, ফ্রিল্যান্সারদের উৎস কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং আইটি খাতের প্রধান হাতিয়ার ল্যাপটপ-কম্পিউটারের ওপর থেকে সব ধরণের উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়ার মতো আমাদের মৌলিক এবং যৌক্তিক দাবিগুলো সরকার এবারের বাজেটের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য আমরা সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তবে এই প্রাপ্তির সমীকরণটি মাঠপর্যায়ে ঠিক কীভাবে কাজ করবে, তা সুনির্দিষ্ট আইনি ধারা ও অর্থনৈতিক ডেটার আলোকে একটু তলিয়ে দেখা দরকার।
কর ও ভ্যাট নীতিমালায় কাঠামোগত স্বস্তি: ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০২৬ ও আইনি ধারার বিশ্লেষণ।
এবারের বাজেটে ভ্যাট আইন ও আয়কর আইনের বেশ কিছু ধারা, উপধারা ও তফসিলে (Schedules) যুগান্তকারী সংশোধন এনে আইটি ও অনলাইন সেক্টরের দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা দূর করা হয়েছে।
ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন সুবিধা: মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৪৫-এর উপধারা ১ এবং বিধি ৪৭-এর বিশেষ সংশোধনীর (অর্থ আইন, ২০২৬-এর সেকশন ২৪ দ্বারা পরিমার্জিত) মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন বা দাখিলপত্র জমা দেওয়ার তীব্র ভোগান্তি থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে উদ্যোক্তারা প্রতি মাসে না দিয়ে প্রতি ৩ মাস পর পর, অর্থাৎ ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বছরে মাত্র ৪ বার ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। এটি কমপ্লায়েন্স কস্ট বা ব্যবসায়িক प्रशासनिक ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
ভ্যাট অডিট রেয়াত ও ডিজিটালাইজেশন: একই সাথে ব্যবসায়ীরা যাতে সহজে ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন, সেজন্য ভ্যাটের অডিট প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড ও সহজ করা হচ্ছে। মূল্য সংযোজন কর আইনের ধারা ৯১ এবং বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) অনুমোদিত ইআরপি (ERP) সফটওয়্যারের মাধ্যমে হিসাব রাখলে তাদের বিশেষ অডিট রেয়াত দেওয়া হবে।
স্টার্টআপ কর অব্যাহতি (Tax Holiday): আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা সেকশন ২২ এবং ও দ্বিতীয় তফসিলের (Second Schedule) সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় নতুন এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর প্রারম্ভিক মূলধনের সংকট দূর করতে এবং ক্যাশ ফ্লো বাড়াতে প্রারম্ভিক ৫ বছরের জন্য করের হার শূন্য শতাংশ (0\%) করার প্রস্তাব পাস করা হয়েছে।
উৎস কর প্রত্যাহার: সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২৪ এবং সেকশন ৫৩-এর বিশেষ সংশোধনী অনুসারে, international ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন YouTube, Facebook, TikTok এবং গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস থেকে উপার্জিত বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ওপর বিদ্যমান ৭.৫% উৎস কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে স্বতন্ত্র ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় এখন থেকে সম্পূর্ণ করমুক্ত ও ভ্যাটমুক্ত থাকবে।
ই-কমার্সের স্থায়ী শিল্প ও স্বতন্ত্র ট্রেড লাইসেন্স ক্যাটাগরির স্বীকৃতি
এই বাজেটের অন্যতম ঐতিহাসিক দিক হলো, ই-কমার্স বা ডিজিটাল কমার্সকে কেবল একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে একে জাতীয় শিল্প নীতিমালার (National Industrial Policy) অধীনে একটি স্বতন্ত্র *'সেবা শিল্প' (Service Industry)* হিসেবে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
একই সাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের 'ডিডিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১'-এর ধারাবাহিকতায় এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) কর তফসিল, ২০২৪-এর বিশেষ সংশোধনী ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস বিধিমালা (Section 12) অনুযায়ী নতুন গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাগুলোতে ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসার জন্য কোনো জটিলতা বা অন্যান্য ক্যাটাগরির সাথে গুলিয়ে না ফেলে, সরাসরি একটি স্বতন্ত্র ও নির্দিষ্ট 'ডিজিটাল কমার্স ক্যাটাগরি'-তে ট্রেড লাইসেন্স ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ইস্যু ও নবায়ন করা হবে। শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ই-কমার্স লজিস্টিকস, সরবরাহ সেন্টার ও ওয়্যারহাউজগুলো এখন থেকে বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে শিল্প হারে বিদ্যুৎ, পানি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের সুবিধা পাবে, যা ব্যাকএন্ড অপারেশনাল খরচ বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনবে।
প্রযুক্তিপণ্য, হার্ডওয়্যার ও মোবাইল সেক্টরে শুল্ক হ্রাস: একটি অর্থনৈতিক ডাটা ও পরিসংখ্যান। ডিজিটাল কমার্স ও আইটি খাতের ব্যাকএন্ড অবকাঠামো শক্তিশালী করতে কাস্টমস ট্যারিফ এবং অগ্রিম করে যে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা খাতের গতিশীলতা অনেক বাড়িয়ে দেবে।
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার: কাস্টমস অ্যাক্ট, ২০২৩-এর প্রথম তফসিল (First Schedule, H.S. Code 84.71) সংশোধন করে এই খাতটির ওপর থাকা পূর্বের উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার (0\%) করা হয়েছে। এর ফলে সরাসরি আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক ও ভ্যাট মওকুফ হওয়ায় ফ্রিল্যান্সার ও আইটি কর্মীদের হার্ডওয়্যার খরচ নাটকীয়ভাবে কমবে।
পেরিফেরাল ডিভাইস ও অগ্রিম আয়কর হ্রাস: কম্পিউটার প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও পোর্টেবল ডাটা ডিভাইসের ওপর আগে যেখানে আয়কর আইনের ধারা সেকশন ১২০ অনুযায়ী ৫% অগ্রিম আয়কর (AIT) বিদ্যমান ছিল, প্রস্তাবিত বাজেটে তা কমিয়ে ২% করা হয়েছে, যা আইটি অফিস ও ডেটা সেন্টারের ব্যাক-অফিস খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।
পিওএস (POS) ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো: খুচরা ও ওমনিচ্যানেল রিটেইলে পেমেন্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়নে পয়েন্ট অব সেলস (POS) মেশিনের ওপর থাকা পূর্বের ১০% আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫% করা হয়েছে এবং ৭.৫% অগ্রিম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার (0\%) করা হয়েছে, যা ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
টেলিকম ও সিম ট্যাক্স প্রত্যাহার: গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেট পেনিট্রেশন বাড়াতে মোবাইল সিম কার্ড ট্যাক্সের ওপর থাকা ৩০০ টাকার স্থায়ী কাস্টমস শুল্ক ও সম্পূরক কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার (0 টাকা) করা হয়েছে, যা মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা সাধারণ মানুষের জন্য আরও সস্তা করবে। গ্রাহকদের ইন্টারনেট ব্রাউজিং ও ডিজিটাল ট্রানজেকশনের খরচ কমাতে ভোক্তা পর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ওপর বিদ্যমান ১২% উৎস কর কমিয়ে ১০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় মোবাইল উৎপাদন ও চিপ শিল্প (Hi-Tech): দেশীয় মোবাইল উৎপাদন শিল্পের ক্ষেত্রে, স্থানীয় পর্যায়ে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন উৎপাদন নিশ্চিত করতে ২২টি প্রধান কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর কমিয়ে ১% করা হয়েছে এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা বজায় রাখা হয়েছে। সবশেষে, সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ ডিজাইন শিল্পের মতো হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং এবং লজিস্টিকস ট্র্যাকিং ডিভাইসের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে মাত্র ১% কাস্টমস শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ভ্যাটসহ অন্যান্য কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।
মেগা প্রজেক্ট, বাজেট বরাদ্দ এবং লজিস্টিকস আধুনিকায়ন
বাজেট বক্তৃতায় এবার ই-কমার্স ও আইটি খাতের জন্য সরাসরি বরাদ্দ এবং পরিবেশবান্ধব পরোক্ষ প্রজেক্টের একটি সুষম রূপরেখা দেখা গেছে। তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এআই-নির্ভর প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরিতে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রাথমিক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর (CSR) খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ যৌথ-বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা হবে।
ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রকল্প: ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডেলিভারি নেটওয়ার্ক। বাজেটে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) আওতায় ডাক বিভাগের দেশব্যাপী বিস্তৃত অবকাঠামোকে ডিজিটাল লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশব্যাপী নির্ভরযোগ্য ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) এবং হোম ডেলিভারিতে স্মার্ট ট্র্যাকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সেন্টার বরাদ্দ: সামগ্রিক আইসিটি অবকাঠামো, জাতীয় ডেটা সেন্টার এবং সাইবার স্পেসের সুরক্ষায় ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ডিজিটাল কমার্সের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করবে।
গ্রিন লজিস্টিকস ও বৈদ্যুতিক যান (EV): বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে পরিবেশবান্ধব ডেলিভারি ইকোসিস্টেম বা গ্রীন এনার্জি সাপোর্টের অংশ হিসেবে কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল সংশোধন করে বৈদ্যুতিক যান (EV) আমদানির মোট করভার ৯৩% থেকে কমিয়ে6৪% করা হয়েছে। কমার্শিয়াল ইভি বাস ও চার্জিং স্টেশনের সব শুল্ক-কর মওকুফ করা হয়েছে, যা ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর 'লাস্ট-মাইল' ডেলিভারি কস্ট অন্তত ১৫-২০% কমিয়ে আনবে। এছাড়া সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৫% এর নিচে নামানোয় আইটি ডেটা সেন্টারগুলোর ব্যাকআপ বিদ্যুৎ খরচ কমবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ই-কমার্স মার্কেটে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
এই প্রস্তাবিত বাজেট যদি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ডিজিটাল কমার্স মার্কেটে একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।
বিলিয়ন ডলার মার্কেট প্রজেকশন: বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ই-কমার্স বাজারের যে আকার, তা এই কর ছাড় ও অবকাঠামোগত সহায়তার কারণে আগামী ৩ বছরের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্কে পৌঁছাবে বলে আশা করা যায়।
ক্যাশলেস লেনদেন ৩০% বৃদ্ধি: POS মেশিনের শুল্ক হ্রাস এবং সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ডিজিটাল পেমেন্টের হার বর্তমানের চেয়ে অন্তত ৩০% বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি সরকারের 'ক্যাশলেস বাংলাদেশ' লক্ষ্যমাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।
নতুন ২ লক্ষ কর্মসংস্থান: একইভাবে ফ্রিল্যান্সিং ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমি সম্পূর্ণ করমুক্ত করায় আগামী দুই বছরে আইটি ও ই-কমার্স সাপ্লাই চেইনে আরও অন্তত ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা তরুণদের বেকারত্ব দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে। ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের দাম কমায় দেশের আইটি ফ্রন্ট-এন্ড কর্মীদের উৎপাদনশীলতা সার্বিকভাবে ২৫% বৃদ্ধি পাবে।
দ্বিমুখী বাস্তবতা: শতভাগ বাস্তবায়ন বনাম আংশিক বাস্তবায়নের প্রভাব
তবে এই প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর দেশের ৫ লাখ উদ্যোক্তার ভাগ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করছে। এর ফলাফল ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুই দিকেই যেতে পারে।
সবগুলো প্রস্তাব যদি মাঠ পর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হয় এবং কাস্টমস ও ট্যাক্স পলিসি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে এটি ই-কমার্সকে দেশের মূলধারার অর্থনীতির চালিকাশক্তি বানাবে। ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তারা লিগ্যাল কাঠামোর মধ্যে এসে ব্যবসা বড় করতে পারবেন। ব্যাংকিং চ্যানেলে ট্রানজেকশন বাড়ায় ট্যাক্স টু জিডিপি (Tax-to-GDP) রেশিও উন্নত হবে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক ডিজিটাল বাণিজ্যের অন্যতম হাবে পরিণত হবে।
কিন্তু এর উল্টো পিঠও আছে। এই নীতিমালা যদি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা এই খাতের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে জানবে। উদাহরণস্বরূপ, ৩ মাস পর পর ভ্যাট রিটার্নের সুবিধা দেওয়ার পর যদি এনবিআর (NBR)-এর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ছোট উদ্যোক্তাদের নথিপত্র নিয়ে হয়রানি অব্যাহত রাখেন, তবে উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। ল্যাপটপ বা পিওএস (POS) মেশিনের শুল্ক ছাড়ের সুবিধা যদি কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমদানিকারকরা বন্দর থেকে খালাস করতে না পারেন, তবে বাজারে এগুলোর কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে এবং দাম আরও বাড়বে। একইভাবে, ডাক বিভাগের লজিস্টিকস প্রজেক্টটি যদি স্বচ্ছতার সাথে দ্রুত বাস্তবায়িত না হয়, তবে ঢাকার বাইরের হাজারো এসএমই (SME) উদ্যোক্তা কুরিয়ার সার্ভিসের উচ্চ খরচের যাঁতাকলে পিষ্ট হতেই থাকবেন। আংশিক বাস্তবায়ন মূলত বড় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেবে, কিন্তু তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের চরম বৈষম্যের মুখে ঠেলে দেবে।
উদ্যোক্তা হিসেবে আমার প্রতিক্রিয়া ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন
একজন ডিজিটাল কমার্স উদ্যোক্তা এবং এই খাতের নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষক হিসেবে আমি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেটকে "স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ব্যবসাবান্ধব রূপরেখা" হিসেবে স্বাগত জানাই। কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার, ই-কমার্সকে সেবা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি এবং ভ্যাট রিটার্ন সহজীকরণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, "একটি চমৎকার নীতিও যদি মাঠপর্যায়ে ভুলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কোনো নীতি না থাকার চেয়েও ক্ষতিকর।" ডিসিআরএএফ (DCRAF) এবং ই-ক্যাবের পক্ষ থেকে বারবার জোর দিয়েছি যে, নীতিমালার সুফল যেন প্রান্তিক উদ্যোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
ট্যাক্স ও ভ্যাট ছাড়ের এই চমৎকার ঘোষণার পাশাপাশি, এই ৫ লাখ উদ্যোক্তার বড় অংশ—বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য—সহজ শর্তে জামানতবিহীন 'স্মার্ট ফাইন্যান্সিং' বা ঋণের কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এই বাজেটে সরাসরি অনুপস্থিত, যা কিছুটা হতাশাজনক। ই-কমার্স এখন সেবা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি (BRPD) সার্কুলারের মাধ্যমে অবিলম্বে কুটির ও ক্ষুদ্র (CMSME) খাতের ঋণের আওতা পুনর্নির্ধারণ করে অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ ক্রেডিট লাইন বা পুনঃতহবিল স্কিম ঘোষণা করা উচিত। একই সাথে, ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করতে কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনে গ্রাহকদের জন্য অন্তত ১-২% সরাসরি কর রেয়াত বা ক্যাশব্যাক সুবিধা চালুর বিষয়টি চূড়ান্ত বাজেটে বিবেচনা করা উচিত।
সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান থাকবে, এই ঘোষিত প্রণোদনা, শুল্ক ছাড় ও আইনি সংস্কারের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং ই-ক্যাবের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি *"যৌক্তিকভাবে শক্তিশালী বাজেট বাস্তবায়ন ও মনিটরিং সেল"* গঠন করা হোক। তবেই এই ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
Comments