মূল্যস্ফীতি বাড়ার মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংক কেন সুদ হার অপরিবর্তিত রাখল
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সব পণ্য ও সেবার দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বোঝাই যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি আবার দুই অঙ্কের ঘরে ঢুকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়াবে, অন্তত ১০ শতাংশে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রধান সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, সম্প্রতি দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চালুর বিষয়গুলো মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নীতি সুদহারে কোনো পরিবর্তন আনার আগে তারা দেশীয় ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ধাক্কার প্রভাব মূল্যায়ন করবে। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে থাকলেও চলতি অর্থবছরের সরকারের নির্ধারিত ৭.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি এখনো বেশি।
জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি বা রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করেছিল। ছয় বছরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার কমানোর ঘটনা।
মুদ্রানীতি কমিটি গতকাল জানিয়েছে, বেশ কিছু কারণে আবারও পণ্যের দাম বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম এখনো অস্থির। একই সময়ে সরকার দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোও শিগগির চালু হতে যাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এসব ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত অপেক্ষা করার নীতি নিয়েছে। এসব বিষয় মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে হচ্ছে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সুদহার বাড়ানোর বা কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৬ শতাংশ। ওই মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহায়তা করার জন্য মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করতে চেয়েছিলেন। এটি তার পূর্বসূরি আহসান এইচ মনসুরের সময় নেওয়া তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান থেকে একটি পরিবর্তন।
২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৪.৭৫ শতাংশে রেখেছিল। এরপর বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সুদহার বাড়াতে থাকে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে এটি রেকর্ড ১০ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছর পর্যন্ত সুদহার ওই ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত ছিল।
জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করে। ছয় বছরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ সিদ্ধান্তকে বিচক্ষণ বলে মনে করেন, কারণ দেশ বিশেষ করে জ্বালানি খাতে কাঠামোগত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
যদিও জুলাই ও আগস্টে মূল্যস্ফীতি কমেছে, তবুও তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমান অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপ, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নীতি সুদহার কমানো হলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। এখন সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থানও দুর্বল হতে পারে।
তাই সতর্ক অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয়, বিনিময় হার, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা মূল্যায়নের জন্য সময় পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান। তবে তিনি আরও বলেন, শুধু নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখাই যথেষ্ট হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতির কার্যকর সঞ্চালন বা ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা উন্নত করতে হবে এবং ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
যদি খাদ্য ও জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতি সুদহার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
চলতি অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছু বড় অর্থনীতি, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে, সুদহার বাড়ানোর পথে থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাদের মূল সুদহার বাড়িয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সুদহার ৩.৫০-৩.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫-৪ শতাংশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ট্রাম্প সুদহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কম সুদে ঋণ দেওয়ার বিভিন্ন ব্যবস্থা বা কনসেশনাল ক্রেডিট উইন্ডোর মাধ্যমে অতিরিক্ত তারল্য সরবরাহ করা হলে কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবও কিছুটা কমে যেতে পারে।
তাই মূল নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত চলতি অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যের প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করছে না। যে দেশে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি মোট অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি, সেখানে শুধু নীতি সুদহার ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ ঋণ গ্রহণের খরচ বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে, ব্যবসার চলতি মূলধনের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
Comments