ভুয়া ডাক্তার শুধু প্রতারণা নয়: এটি মানুষের জীবনের বিরুদ্ধে অপরাধ
প্রেক্ষাপট: যমুনা টিভির প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত ভুয়া MBBS চিকিৎসক ও সনদসংক্রান্ত অভিযোগ। প্রতিবেদনের দাবিগুলো স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
একজন মানুষ যখন অসুস্থ হন, তখন তিনি চিকিৎসকের কাছে শুধু ওষুধ চান না—তিনি নিজের জীবন, আশা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ একজন পেশাজীবীর হাতে তুলে দেন। সেই বিশ্বাসকে ব্যবহার করে কেউ যদি ভুয়া চিকিৎসক সেজে রোগী দেখেন, প্রেসক্রিপশন দেন বা চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে খেলেন, তাহলে সেটিকে সাধারণ প্রতারণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জনস্বাস্থ্য ও মানবজীবনের জন্য গুরুতর হুমকি।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেশজুড়ে ভুয়া MBBS চিকিৎসকের একটি বিস্তীর্ণ নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত সনদ/পরিচয় তৈরির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিষয়টি সত্যতা ও দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তবে অভিযোগের প্রকৃতি এতটাই গুরুতর যে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নীরব থাকা বা কেবল ঘটনার পর অভিযান চালানো কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো ভিডিও, পোস্ট বা সংবাদে কাউকে অভিযুক্ত দেখানো হলেই তিনি আইনগতভাবে অপরাধী হয়ে যান না। প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, BM&DC নিবন্ধন, চিকিৎসা কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে যাচাই করতে হবে। কিন্তু তদন্তে যদি কেউ ভুয়া পরিচয়ে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন এবং মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে থাকেন, তাহলে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (BM&DC) চিকিৎসকদের নিবন্ধন ও চিকিৎসা পেশার মান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে এবং নিবন্ধন যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিজস্ব মূল্যায়ন নথিতেও সীমিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকির কারণে ভুয়া ও অননুমোদিত চিকিৎসকদের সুযোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, ভুয়া চিকিৎসক তৈরি হওয়ার পর অভিযান কেন? রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা কেন? একটি উপজেলা, ইউনিয়ন বা গ্রামীণ বাজারে কে চিকিৎসা দিচ্ছেন, কোন প্রতিষ্ঠানে বসছেন, তাঁর BM&DC নিবন্ধন নম্বর কী—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে যাচাই করা কি সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব। প্রযুক্তি, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং BM&DC-এর সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে এটি নিয়মিত করা যায়।
আমাদের স্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থাকে 'reactive' বা ঘটনার পর প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থেকে 'proactive' বা আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় যেতে হবে। প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়কে নিজ নিজ এলাকার বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি, চেম্বার ও গ্রামীণ চিকিৎসাকেন্দ্রের একটি নিয়মিত ঝুঁকি-মানচিত্র তৈরি করতে হবে। যেসব এলাকায় ভুয়া ডাক্তার, অননুমোদিত চিকিৎসা বা সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের অভিযোগ বেশি, সেখানে নিয়মিত পরিদর্শন হতে হবে।
সিভিল সার্জনদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে—তবে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অপরাধী ঘোষণা নয়। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ভুয়া চিকিৎসা চলার প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর নজরদারি না থাকলে, কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভুয়া চিকিৎসকদের বিষয়ে 'কঠোর ব্যবস্থা' বলতে শুধু জরিমানা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া বোঝালে চলবে না। যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে কেউ জেনেশুনে ভুয়া চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখেছেন, মিথ্যা ডিগ্রি বা সনদ ব্যবহার করেছেন, প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন বা চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন, তাহলে দ্রুত মামলা, গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। তবে গ্রেপ্তার ও দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই আইনি প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সম্প্রতি ভুয়া পরিচয়ে চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনায় মোবাইল কোর্টের সাজাও হয়েছে—অর্থাৎ প্রয়োগের সুযোগ ও আইনি পথ বিদ্যমান।
আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো সাধারণ মানুষের সচেতনতার ঘাটতি। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ অনেক সময় সহজ-সরল বিশ্বাসে 'ডাক্তার' লেখা সাইনবোর্ড, সাদা অ্যাপ্রন বা প্রেসক্রিপশন দেখে কাউকে চিকিৎসক ধরে নেন। অথচ চিকিৎসকের পরিচয় যাচাই করা তাদের অধিকার। BM&DC-এর অনলাইন রেজিস্ট্রেশন যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করে চিকিৎসকের নিবন্ধন পরীক্ষা করা যায়।
সরকারের উচিত প্রতিটি ইউনিয়ন ও বাজার পর্যায়ে সহজ ভাষায় প্রচার চালানো: 'ডাক্তার নাম দেখলেই বিশ্বাস নয়—রেজিস্ট্রেশন নম্বর যাচাই করুন।' স্থানীয় মসজিদ, মন্দির, স্কুল, বাজার কমিটি, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পরিষদ, ফার্মেসি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সচেতনতা ছড়ানো যেতে পারে। একটি ছোট পোস্টার বা মাইকিংয়ের বার্তাও অনেক জীবন রক্ষা করতে পারে।
জনগণের জন্য কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: চিকিৎসকের BM&DC নিবন্ধন নম্বর দেখতে চান; সন্দেহ হলে সরকারি স্বাস্থ্য অফিস বা BM&DC-এর মাধ্যমে যাচাই করুন; অস্বাভাবিক 'সব রোগের চিকিৎসা', অলৌকিক চিকিৎসা বা গোপন ওষুধের দাবি থেকে দূরে থাকুন; ভুয়া ডিগ্রি/সনদ বা সন্দেহজনক চিকিৎসা দেখলে তথ্য-প্রমাণসহ কর্তৃপক্ষকে জানান।
সরকারের জন্যও একটি জাতীয় 'ফেক ডক্টর জিরো টলারেন্স' কার্যক্রম বিবেচনা করা উচিত। একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ নম্বর/ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, জেলা-ভিত্তিক নিয়মিত অভিযান, নিবন্ধন যাচাইয়ের দ্রুত ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা, এবং অভিযানের ফলাফল প্রকাশ—এসব থাকলে মানুষও বুঝবে যে রাষ্ট্র বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, স্বাস্থ্যসেবায় একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। একজন ভুয়া চিকিৎসক পাঁচজন, পঞ্চাশজন বা পাঁচশজন রোগীকে ক্ষতি করার পর তাকে ধরার অর্থ হলো রাষ্ট্র ইতিমধ্যে বহু মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে দিয়েছে। তাই নজরদারি হতে হবে আগাম, অভিযান হতে হবে নিয়মিত, তথ্য হতে হবে উন্মুক্ত এবং জবাবদিহি হতে হবে বাস্তব।
ভুয়া চিকিৎসা কোনো হাস্যকর বিষয় নয়, কোনো ছোটখাটো ব্যবসায়িক প্রতারণাও নয়। ভুল চিকিৎসায় একজন মানুষের জীবন যেতে পারে, একটি পরিবার নিঃস্ব হতে পারে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে। তাই প্রমাণিত ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যারা দায়িত্বে থেকেও এমন কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের ভূমিকা ও জবাবদিহিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব মানুষকে শুধু হাসপাতাল বানিয়ে দেওয়া নয়; মানুষ যেন নিরাপদ হাতে চিকিৎসা পায়, সেটিও নিশ্চিত করা। আর সাধারণ মানুষের দায়িত্ব—'ডাক্তার' পরিচয়কে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে যাচাই করা। এখন সময় প্রতিক্রিয়াশীল অভিযান নয়, নিয়মিত ও আগাম নজরদারির। কারণ চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি ভুলের মূল্য অনেক সময় একটি জীবন।
লেখক: গ্রাহক অভিজ্ঞতা বিশেষজ্ঞ
Comments