বিনিয়োগে খরা, অনিশ্চয়তায় শিল্প
দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর মতে,বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতির বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই। তবে সরকারের এই আহ্বানের বিপরীতে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা। বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাইয়ের হালনাগাদ তথ্য বলছে,চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন শিল্প স্থাপন, বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা নতুন যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী,চলতি বছরের জুলাইয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
অন্যদিকে, জুলাইয়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯৩ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২০৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে,বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু অর্থের জোগান কিংবা ঋণের সুদহারই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং ব্যবসায়িক পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাও বড় ভূমিকা রাখে। ফলে সুদ কমা, ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য এবং আমদানি নীতি তুলনামূলক শিথিল হওয়ার পরও বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি ফিরছে না।
বিশ্লেষকদের মতে,বিনিয়োগের স্থবিরতাকে এখন আর শুধু উচ্চ সুদহার কিংবা অর্থের সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি,গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা,উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি,দুর্বল চাহিদা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ, সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
বিশেষ করে গ্যাসের সংকট শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার কোথাও কারখানা সচল রাখতে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং নতুন সক্ষমতা তৈরির ঝুঁকিও বাড়ছে।
উদ্যোক্তারা এখন ঋণের সুদহারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ,উৎপাদন ব্যয়,পণ্যের চাহিদা এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও হিসাব করছেন। অনিশ্চিত পরিবেশে নতুন প্রকল্পে অর্থ ঢালার পরিবর্তে অনেক ব্যবসায়ী বিদ্যমান কারখানা ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ফলে একদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য রয়েছে,ঋণের সুদও আগের তুলনায় কমেছে;অন্যদিকে বিনিয়োগের জন্য ঋণের চাহিদা ও শিল্পের সম্প্রসারণে দৃশ্যমান গতি নেই। আমদানি নীতি শিথিল হওয়ার পরও মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে, সমস্যাটি অর্থের প্রাপ্যতার চেয়ে বড় হয়ে এখন আস্থা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের সংকটে রূপ নিচ্ছে।
Comments