চলতি অর্থবছরেই সব স্থানীয় নির্বাচন, বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি
চলতি অর্থবছরের মধ্যেই দেশের সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হবে। নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের অধীনেই সম্পন্ন হবে।
তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণা, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগসহ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক সব কার্যক্রম কমিশনই পরিচালনা করবে।
কমিশনের প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ ও অর্থ বিভাগ আলোচনা করে কোন নির্বাচন আগে এবং কোনটি পরে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচনের জন্য সরকারের কোনো 'গ্রিন সিগন্যাল' প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত হয়ে তফসিল ঘোষণা করতে চাইলে তা করতে পারবে। কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দেবে।
থাকছে না দলীয় প্রতীক
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবার দলীয় প্রতীক ও দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে হবে না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত পাঁচটি অধ্যাদেশ নতুন সরকার সংসদে আইন হিসেবে পাস করেছে। এসব আইনে দলীয় মনোনয়ন এবং জাতীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল করা হয়েছে।
ফলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হবে নির্দলীয়ভাবে এবং সাধারণ প্রতীকে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারবে।
মীর শাহে আলম জানান, বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতাদের পর্যায়ক্রমে প্রতি শুক্র ও শনিবার গুলশান কার্যালয়ে ডেকে বৈঠক করছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়ার ইতিহাস, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে জয় পাওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং এলাকায় যাদের সততা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, এমন প্রার্থীদের সমর্থনের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময় আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে না থাকা শুধু নির্বাচনী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতাদের সমর্থন না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে আন্দোলনে দীর্ঘদিনের ভূমিকা থাকলেও নির্বাচনী অভিজ্ঞতা কম—এমন নেতাদের অন্যভাবে দায়িত্বে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের আশ্বাস
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের সরকারি প্রভাব থাকবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার না করার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সরকার সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সমালোচনা করেন প্রতিমন্ত্রী।
তার ভাষ্য, বিদ্যুতের সংকটের কথা বলার সময় সভা বা মঞ্চে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। একইভাবে লং মার্চ কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক সমস্যার জন্য জনগণের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে এবং সংসদে প্রধানমন্ত্রী তা তুলে ধরবেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
৮-১০ দিনের মধ্যে ই-রিকশার বিধিমালা
অটোরিকশা ও ই-রিকশার বিষয়ে নতুন বিধিমালা আগামী ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, সংসদে এ-সংক্রান্ত আইন পাস হয়েছে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গতিসীমার ব্যাটারিচালিত অটো-ইজিবাইককে 'ই-রিকশা' হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এসব যানবাহনের নিবন্ধন দেবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা।
বিধিমালায় নিবন্ধন ও নবায়ন ফি এবং ই-রিকশার কারিগরি সনদের বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল বিভাগ থেকে কারিগরি সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এতে ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর থাকবে।
নিবন্ধনের পর কোন সড়কে ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে, আর কোন সড়কে পারবে না—তা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জেলা পর্যায়ে এ সিদ্ধান্তে থাকবে জেলা প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগ। আর সিটি করপোরেশন এলাকায় সিদ্ধান্ত নেবে সিটি করপোরেশন।
প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ার পর ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই সাংবাদিকদের ডেকে বিধিমালার কপি প্রকাশ করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে কেন্দ্র থেকে তাকে মনোনয়ন বা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় বিএনপি সিদ্ধান্ত নেবে বলে উল্লেখ করেন মীর শাহে আলম।
এ সময় নতুন উপজেলা মোকামতলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
Comments