নেপালের বন্যার ঢল গঙ্গায়, প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশে
নেপালের তিব্বত সীমান্তঘেঁষা রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ৫৭৯ জন ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। হিমবাহ ধস ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টির পর নেমে আসা এই প্রবল ঢল ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী হয়ে ভারতের গঙ্গা অববাহিকায় প্রবেশ করছে। ফলে গঙ্গার পানিপ্রবাহের মাধ্যমে এর কিছুটা প্রভাব বাংলাদেশেও পৌঁছাতে পারে।
তবে নেপালের বন্যার পানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করবে এবং সমতল এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। তাই সরাসরি বড় ধরনের বন্যা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা আপাতত কম বলে মনে করছেন বাংলাদেশের ভূতত্ত্ববিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা। তবে উজানে বৃষ্টিপাত ও আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির উচ্চতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া এলাকায় আকস্মিক এ বন্যা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় বরফ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরবর্তী সময়ে ওই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর প্রবল গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে।
বন্যার তীব্রতা কতটা ছিল, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় ত্রিশূলী নদীর একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্যে। সেখানে মাত্র আধা ঘণ্টায় পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভয়াবহ এই ঢল ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী পেরিয়ে নারায়ণী নদীর অববাহিকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। সেতু, সড়ক, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন অবকাঠামো পানির স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেছে। অনেক এলাকায় স্বয়ংক্রিয় নদী পর্যবেক্ষণকেন্দ্রও ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সময়মতো তথ্য পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এ ধরনের আকস্মিক বন্যাকে 'গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড' বা সংক্ষেপে 'গ্লফ' বলা হয়। সাধারণত হিমবাহ বা বরফ-পাথরের ধসের কারণে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরে সেই বাধা হঠাৎ ভেঙে গেলে বিপুল জলরাশি অল্প সময়ে নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। রাসুয়ার সাম্প্রতিক দুর্যোগেও একই ধরনের প্রক্রিয়া ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপালের নদীগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার সরাসরি ভৌগোলিক সংযোগ না থাকলেও পানিপ্রবাহের দিক থেকে এ অঞ্চলের নদীগুলো আন্তঃসংযুক্ত। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানি নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে। পরে গণ্ডক ভারতের বিহার হয়ে গঙ্গায় মিশবে। গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে এই অতিরিক্ত পানি ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাংলাদেশে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব বড় আকার ধারণ করার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন জানান, নেপাল থেকে নেমে আসা পানি বাংলাদেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করবে। পথে পানির প্রবাহ সমতলে ছড়িয়ে পড়ায় এর তীব্রতা অনেকটাই কমে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নেপালের ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এসব হ্রদের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভারত থেকে পাওয়া নদীর পানি ও বন্যা পরিস্থিতির তথ্যও বাংলাদেশের নজরদারিতে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেনও এখনই বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না। তাঁর মতে, নেপালের বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত কয়েক শ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার সময় পানির গতি ও তীব্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে উজানে আগামী কয়েক দিনে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। সে ক্ষেত্রে নতুন করে নদীর পানি বাড়ার পাশাপাশি দ্বিতীয় দফায় বন্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ কারণে ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত এবং নদ-নদীর পানির উচ্চতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন এই গবেষক। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ও তিস্তা ব্যারেজসহ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
এদিকে আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপির যৌথ এক গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলের তিব্বত, নেপাল ও ভারতের নদী অববাহিকায় ৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে নেপালের এবারের ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা কম। তবে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে। তাই উজানের বৃষ্টি, নদীর পানির উচ্চতা ও হিমবাহ-হ্রদের পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পাওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
Comments