বাংলাদেশিদের জন্য ফের উন্মুক্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, ১০ হাজার কর্মী যাবে বিনা খরচে
স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অতীতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাজারটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষমতা মালয়েশিয়া সরকারের হাতে রয়েছে। ওই সমঝোতার মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
১০ হাজার কর্মীর অভিবাসন ব্যয় শূন্য
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে ১০ হাজার কর্মীকে 'জিরো কস্টে' নেওয়ার বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষের নীতিগত সম্মতির কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এই কর্মীদের বিমান ভাড়াসহ অভিবাসন সংক্রান্ত কোনো খরচ বহন করতে হবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে নতুন করে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৩৩৮ এজেন্সির সুযোগ
মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি অনুমোদন পেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সি এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ৪২৩টি এজেন্সির তালিকায় ছিল। বাংলাদেশ সরকার ওই তালিকা থেকে অতীতে বিতর্কিত বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত এজেন্সিগুলো বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানায়।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, দীর্ঘ আলোচনার পর মালয়েশিয়া বিশেষ বিবেচনায় ২৫টি অনুমোদিত এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। সরকারি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশি ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার বাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে।
এজেন্সিগুলোর যাচাই-বাছাই করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
চলতি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন চুক্তির মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও বেশি নিশ্চিত হবে বলে আশা করছে সরকার।
১৬ মেডিকেল সেন্টার দিয়ে শুরু
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারগুলোর তালিকা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার অনুমোদিত তালিকা থেকে বিতর্কিত ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ দিয়ে ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে মেডিকেল সেন্টারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। এরপর নতুন নীতিমালার ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে।
কর্মীদের সুরক্ষায় মনিটরিং সেল
বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কাজে যোগদান এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অভিবাসন সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
টাকা-পয়সা লেনদেনে সতর্ক থাকার আহ্বান
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় সতর্ক করেছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কর্মী পাঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
তাই মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রকাশের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা দেওয়া, মেডিকেল পরীক্ষা করানো কিংবা পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দালাল ও প্রতারক চক্রের বিষয়ে সতর্ক থাকতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করতে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
Comments