১ শতাংশ ফি প্রত্যাহার ও সরকারি প্রণোদনা: ‘বাংলা কিউআর’-এ কি ফিরবে গতি?
বাংলাদেশে একটি সর্বজনীন, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আন্তঃসংযুক্ত (Interoperable) ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে 'বাংলা কিউআর' (Bangla QR) একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার, প্রথাগত ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অভিজাত সুপারশপ—সবাইকে একটি একক কিউআর ব্যবস্থার আওতায় এনে স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কৌশলগত লক্ষ্য। বর্তমান সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি ও 'সবার আগে বাংলাদেশ' দর্শনের মূল ভিত্তি হলো বাজার অংশীজনদের ওপর অহেতুক মাশুলের বোঝা না চাপিয়ে তাদের উৎসাহিত করা। কারণ যেকোনো অর্থনৈতিক নীতি বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করে বাস্তবায়নের সঠিক কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ইতিবাচক আচরণের ওপর। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন এবং ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন ফি কাঠামো প্রমাণ করে যে, অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহার এবং আর্থিক প্রণোদনাই ক্যাশলেস অর্থনীতিতে স্থায়ী রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি।
১ জুলাইয়ের বাধ্যবাধকতা: ১ শতাংশ চার্জে থমকে গিয়েছিল বাজার
বিগত বছরগুলোতে প্রতিটি ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ আলাদা কিউআর কোড ঝুলিয়ে রেখে বাজারে একধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল। এই জটিলতা নিরসনে ২০২৩ সালে পরীক্ষামূলক চালুর পর, বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দেয় যে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশের সব মার্চেন্ট পয়েন্টে কেবল সর্বজনীন 'বাংলা কিউআর' ব্যবহার করা যাবে।
তবে একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করে বাংলা কিউআর পেমেন্টে ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) নির্ধারণ করে। এতে মাঠপর্যায়ের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুনাফার মার্জিন এমনিতেই অতি নগণ্য (মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ)। সেখানে ১ শতাংশ ফি ব্যাংকিং চ্যানেলে চলে গেলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ছোট ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্যবাধকতা থাকার পরও অনেক মার্চেন্ট বাংলা কিউআর সরিয়ে নেন এবং নগদে লেনদেনে ফিরে যান। এতে লেনদেনের গতি থমকে যায়।
১০ আগস্টের বড় সিদ্ধান্ত: ফি প্রত্যাহার ও ২,০০০ টাকা পর্যন্ত উল্টো প্রণোদনা
বাজারের এই স্থবিরতা ভাঙতে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের ব্যবসাবান্ধব দর্শনের প্রতিফলনে ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি যুগান্তকারী আদেশ জারি করে।
প্রথমত, ১ শতাংশ এমডিআর ফি আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (IRF) সম্পূর্ণ 'শূন্য' শতাংশ করা হয়। অর্থাৎ, ক্রেতা স্ক্যান করে পেমেন্ট করলে ব্যাংক বা এমএফএস মার্চেন্টের হিসাব থেকে কোনো চার্জ কাটতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সামর্থ্য বাড়াতে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (NPSB)-এর মাধ্যমে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি লেনদেনে নগদ প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়। পেমেন্ট গ্রহণকারী (Acquiring) প্রতিষ্ঠান পাবে লেনদেনের ০.১০% (হাজারে ১ টাকা) এবং কার্ড/অ্যাকাউন্ট ইস্যুকারী (Issuing) প্রতিষ্ঠান পাবে ০.২০% (হাজারে ২ টাকা)। ফলে ১,০০০ টাকা লেনদেনে মার্চেন্ট পুরো টাকাই পাবেন, আর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৩ টাকা প্রণোদনা পাবে। ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে এটি কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে স্প্লিট ট্রানজেকশন বা কৃত্রিমভাবে লেনদেন ভাগ করে জালিয়াতি রুখতে অডিট ও তদারকির কড়া নিয়ম রাখা হয়েছে।
সিডিসিআরএ (CDCRA)-এর ডেটা: ১ জুলাইয়ের পর কেন লাফিয়ে বাড়ল লেনদেন?
সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (CDCRA)-এর মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করলে বাংলা কিউআর-এর একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক চিত্র পাওয়া যায়:
ঐতিহাসিক যাত্রাপথ ও ১ জুলাইয়ের প্রভাব: ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি 'এক দেশ, এক কিউআর' কাঠামোর অধীনে বাংলা কিউআর-এর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হলেও ব্যাংক ও এমএফএসগুলোর নিজস্ব কিউআরের চাপে এটি ধীরগতিতে চলেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে এতে প্রায় ১,৭০২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। কিন্তু ১ জুলাই ২০২৬ থেকে এটি বাধ্যতামূলক করার পর মাত্র এক মাসেই (জুলাই ২০২৬) রেকর্ড ১,৪৭৫ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়—যা আগের ৩ বছরের মোট লেনদেনকে প্রায় স্পর্শ করে ফেলে।
দৈনিক লেনদেন ও ব্যবহারের হার: বর্তমানে বাংলা কিউআর-এর মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৭০ কোটি টাকার বেশি (দৈনিক প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজারটি) লেনদেন হচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট লেনদেন ৪,৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
মার্চেন্ট অনবোর্ডিং ও গ্রহণযোগ্যতা: সিডিসিআরএ (CDCRA)-এর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ২৪ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট নিবন্ধিত হলেও নিয়মিত কিউআর ব্যবহার করেন মাত্র ২৫% থেকে ৩০% মার্চেন্ট। দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৮% থেকে ১২% মানুষ এই কিউআর ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছেন, আর মোট মার্চেন্ট পেমেন্টে বাংলা কিউআর-এর অবদান এখনো ৬% থেকে ৮%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশলগত মাস্টারপ্ল্যানের মূল লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস মাধ্যমে রূপান্তর করা। বাংলাদেশে প্রতি বছর কাগুজে নোট ছাপানো, সুরক্ষা ও পরিবহনে সরকারের প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা জাতীয় অপচয় হয়, যা বাংলা কিউআর-এর সার্বিক সফলতার মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব।
ইউপিআই অভিজ্ঞতা, 'বিনিময়' ও সাউন্ডবক্স: প্রযুক্তির নতুন সমীকরণ
বাংলা কিউআর-এর এই কাঠামোগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দেশীয় প্রযুক্তির চমৎকার সমীকরণ নির্দেশ করে:
প্রথমত, ভারতের UPI কিংবা ব্রাজিলের Pix পেমেন্ট বিপ্লব ঘটিয়েছিল সম্পূর্ণ 'জিরো-এমডিআর' নীতির ওপর ভর করে, যেখানে সরকার ব্যাংকগুলোকে ভর্তুকি দিয়েছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকার এখন সেই একই সফল ও সাশ্রয়ী মডেল অনুসরণ করছে।
দ্বিতীয়ত, ইন্টার-অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম (IDTP) বা 'বিনিময়' এবং এনপিএসবি (NPSB) নেপথ্যে থেকে ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক আন্তঃসংযোগ সুনিশ্চিত করছে।
তৃতীয়ত, সিডিসিআরএ-এর গবেষণায় উঠে এসেছে 'ডিজিটাল ফাইল ও ক্রেডিট স্কোরিং'-এর সম্ভাবনা। ছোট ব্যবসায়ীদের প্রথাগত জামানত না থাকলেও কিউআর লেনদেনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকগুলো এখন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের ডিজিটাল লোন বা 'স্মার্ট লোন' অফার করছে। এছাড়া, ভুয়া পেমেন্টের ভয় কাটাতে বাজারে এসে গেছে 'স্মার্ট সাউন্ডবক্স' প্রযুক্তি, যা পেমেন্ট হওয়ামাত্রই শব্দ করে পেমেন্টের কথা জানিয়ে দেয়।
চার্জ ফ্রির পরও কেন ক্যাশ পেমেন্টেই ঝোঁক ছোট ব্যবসায়ীদের?
সিডিসিআরএ-এর আইটি রিইটেল ও রিটেইল মার্কেট সার্ভে অনুযায়ী, বাংলা কিউআর গ্রহণে এখনো তিনটি প্রধান বাধা কাজ করছে:
১. এনবিআর-এর কর ভীতি: ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় কাজ করে যে, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য জমা হলে পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) থেকে অযাচিত আয়কর বা ভ্যাটের নোটিশ আসতে পারে।
২. সাপ্লাই চেইন ও ক্যাশ-আউট ফি-এর ফাঁদ: খুচরা বিক্রেতা কিউআরে পেমেন্ট পেলেও পাইকারি বাজারে মালামাল কিনতে গেলে তাকে নগদ টাকা দিতে হয়। এমএফএস ওয়ালেট থেকে টাকা তুলতে গিয়ে ১.৪৭% থেকে ১.৮৫% ক্যাশ-আউট ফি দিতে হয়, যা তার পুরো মুনাফা গ্রাস করে ফেলে।
৩. ডিভাইস ও ইন্টারনেটের ঘাটতি: দেশে এখনো প্রায় ৬ কোটি মানুষ ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। পাশাপাশি প্রান্তিক অঞ্চলের দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ কিউআর ব্যবহারের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।
বাংলা কিউআর সফল করতে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বাংলা কিউআর-কে সর্বজনীন রূপ দিতে নিচের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
১. ছোট ব্যবসায়ীদের কর সুরক্ষা: বার্ষিক ৫০ লাখ টাকার নিচে লেনদেনকারী প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারের ওপর অন্তত আগামী ৫ বছরের জন্য ভ্যাট ও আয়কর অডিট থেকে স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা দিতে হবে, যেন হয়রানিমুক্ত পরিবেশে তারা ব্যবসা চালাতে পারেন।
২. B2B সাপ্লাই চেইন ডিজিটাইজেশন: 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতির আলোকেই দেশীয় বাণিজ্যিক অবকাঠামো শক্তিশালী করতে বড় বড় এফএমসিজি কোম্পানি ও পাইকারি বিক্রেতাদের বাধ্য করতে হবে যেন তারা খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বাংলা কিউআর-এ ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করে। এতে ক্যাশ-আউটের প্রয়োজনীয়তাই থাকবে না।
৩. বিনামূল্যে সাউন্ডবক্স ও প্রচার: প্রণোদনা ফান্ড থেকে ছোট ব্যবসায়ীদের নিখরচায় স্মার্ট সাউন্ডবক্স বিতরণ করতে হবে এবং এলাকাভিত্তিক 'ক্যাশলেস হাট' বা সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে।
নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের সমন্বয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ আগস্ট ২০২৬-এর নতুন আদেশ ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ। ১ শতাংশ ফি প্রত্যাহার ও নগদ প্রণোদনা ঘোষণা দেশের আর্থিক খাতকে বৈষম্যহীন ও স্বাবলম্বী করার পথ সুগম করবে। তবে এই অর্জনের পূর্ণ ফল পেতে হলে রাজস্ব বোর্ডের নীতিগত সুরক্ষা, সাপ্লাই চেইনের ডিজিটাইজেশন এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টাই পারবে ২০২৭ সালের মধ্যে ক্যাশলেস অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে।
Comments