'ভারতে তৈরির নামে দেশি পার্টস সরবরাহ' রেলের সিসিএস দপ্তরের লাখ লাখ টাকার জালিয়াতি
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) দপ্তরের অধীন মালামাল ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা অনিয়ম, দুর্নীতি ও আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'এহসানুল এন্টারপ্রাইজ'সহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে। এ ঘটনায় একাধিক তদন্ত ও অভিযান পরিচালিত হলেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তিবলে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ রেলওয়ের স্টোরস (RS) বিভাগের মাধ্যমে "এমডি-৫২ টাইপ বগির জন্য হুইল সেট গাইড কমপ্লিট" (আইটেম নং: ১০৪-৭৫০০১, পে অর্ডার নং- ১৫৫৬৩২৮) সংক্রান্ত ২০০ পিস সরঞ্জাম ক্রয়ের কার্যাদেশ পায় অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এহসানুল এন্টারপ্রাইজ। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, দরপত্রটি চূড়ান্ত অনুমোদন করেছেন 'ADG (RS)' (অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্টোরস)। সরঞ্জাম সরবরাহের স্থান হিসেবে 'DCOS/SDP' এবং পরিদর্শন-সংক্রান্ত দপ্তর হিসেবে 'DCOS (Inspection), Pahartali' উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে প্রতি পিস হুইল সেট গাইডের ক্রয়মূল্য ২৩ হাজার ৮৭৫ টাকা হিসেবে সর্বমোট ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্র ও কাগজে-কলমে মালামালগুলো ভারতের "শিকা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস" থেকে আমদানির কথা ছিল। তবে শিকা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস কর্মকর্তারা জানান, তারা এসব মালামাল তৈরিই করেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতীয় মালামালের নামে এসব সরঞ্জাম প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রামের কদমতলীর একটি স্থানীয় ওয়ার্কশপ থেকে অতি নিম্নমানের উপাদানে তৈরি করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণে তৈরির কারণে কদমতলীতে প্রতি পিসের খরচ পড়েছে মাত্র ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। ৩-৪ হাজার টাকার দেশি সরঞ্জাম ভারতে তৈরি দেখিয়ে প্রায় ২৪ হাজার টাকা দরে গছিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, রেলওয়ের তালিকাভুক্ত শত শত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সিসিএস দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট বা প্রতিষ্ঠানকে (যেমন—এহসানুল এন্টারপ্রাইজ) কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রের শর্তাবলি নিজেদের মতো করে ম্যানিপুলেট বা পরিবর্তন করে।
এদিকে কারিগরি বিভাগের সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম পাহাড়তলী এবং সৈয়দপুরে রেলের নিজস্ব দুটি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য যন্ত্রাংশ তৈরি না হলেও এই দুই কারখানার হাজারো কর্মচারী ও শতাধিক কর্মকর্তার পেছনে সরকারের প্রতি বছর বড় অঙ্কের বাজেট ও বেতন-ভাতা ব্যয় হচ্ছে। কারখানায় পার্টস বানানোর নামে শত কোটি টাকার বরাদ্দ নেওয়ার পাশাপাশি বিদেশ থেকে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কেনা হচ্ছে। এ সুযোগে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ তৈরি ও সরবরাহ দেখিয়ে কমিশন বাণিজ্য চালাচ্ছেন এক শ্রেণির কর্মকর্তা। অনেক ক্ষেত্রে এসব মালামাল কাগজে-কলমে স্টোরে সংরক্ষিত দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তদন্ত ও অডিটে অনিয়ম প্রমাণিত হলেও ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে তা গোপন রেখে পার পেয়ে যান জড়িতরা।
জালিয়াতির বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পাহাড়তলী ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ডিডিওএস পরিদর্শন দপ্তর) মো. আবু জাফরের কাছে জানতে চাইলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, "এ কাজটি আমাদের দপ্তর থেকে দেওয়া হয়নি। এটি সম্ভবত সৈয়দপুর কারখানা থেকে দেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।"
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এহসানুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আলমগীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "কাজটি অনেক আগের নেওয়া। আমি কয়েকদিন যাবৎ একটু ব্যস্ত আছি। আপনার সাথে দেখা করে বিস্তারিত বলব।"
Comments