ইমরান খানের অধিকার রক্ষায় যুক্তরাজ্যের হস্তক্ষেপ চান সাবেক স্ত্রী জেমাইমা
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে অমানবিক আচরণ এবং তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যুক্তরাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তাঁর সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথ। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইমরানের চিকিৎসা, পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেমাইমা বলেন, পাকিস্তান সরকারকে অবশ্যই দেশটির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ইমরানকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে, পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং দীর্ঘদিনের একাকী বন্দিত্বের অবসান ঘটাতে হবে।
গত ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বোর্ডের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসার কথা ছিল। তবে তাঁকে শিফা হাসপাতালে না নিয়ে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে সুস্থ ঘোষণা করার পর আবার আদিয়ালা কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে শনিবার সুপ্রিম কোর্টে সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পিটিশন দায়ের করে দলটি।
জেমাইমা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, 'যুক্তরাজ্য আর কত দিন নীরব থাকবে?'
ইমরানের সাবেক স্ত্রী অভিযোগ করেন, প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে থাকা ইমরানকে দীর্ঘ সময় একাকী রাখা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আইনজীবী ও চিকিৎসকদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ সীমিত করা হয়েছে।
জেমাইমার দাবি, ইমরানের পরিবারের সদস্যদের প্রায় ১০ মাস ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তিনি এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা বিধির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ওই বিধি অনুযায়ী টানা ১৫ দিনের বেশি একাকী বন্দিত্ব নিষিদ্ধ।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ
জেমাইমা বলেন, ইমরানের চিকিৎসা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে হস্তক্ষেপ করেছেন। আদালত তাঁকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পরিবারের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং দুই ছেলের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, এসব নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর করা হচ্ছে না।
তাঁর মতে, বিষয়টি এখন আর কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু নয়। তাই যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।
দুই ছেলেরও সাক্ষাৎ না পাওয়ার অভিযোগ
জেমাইমা নিজের দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিম খানের পক্ষ থেকেও আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হাজার হাজার মাইল দূর থেকে তাঁরা তাঁদের বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখছেন।
জেমাইমার অভিযোগ, তাঁর দুই ছেলেকে ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তাঁদের ভিসা দেওয়া হয়নি এবং পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তাঁদের গ্রেপ্তারের হুমকিও দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলার সুযোগও তাঁদের দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
জেমাইমা আরও বলেন, সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, তাঁর দুই ছেলে পাকিস্তানে গিয়ে ইমরানের সঙ্গে দেখা করার পর গ্রেপ্তার হলেও যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
ইমরানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরে জেমাইমা বলেন, ইমরান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং কয়েক বছর ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেছেন।
পাকিস্তানে প্রথম বিনা মূল্যের ক্যানসার হাসপাতাল ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ ইমরানের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জেমাইমার ভাষ্য, ইমরানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের। পাকিস্তান কমনওয়েলথের সদস্য এবং নির্বিচার আটক, অমানবিক আচরণ ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে যুক্তরাজ্যের। এসব নীতি শুধু সুবিধাজনক সময়ে প্রয়োগ করলে তার কোনো অর্থ থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আগস্টের শুরুতে ইমরানের দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলায়মান খানও তাঁদের বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁরা দাবি করেন, কয়েক মাস ধরে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।
তাঁদের দাবি, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তাঁরা বাবাকে দেখেননি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাননি।
তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় তাঁদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, কাসিম ও সুলায়মানের বিদেশি পাকিস্তানিদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে ভিসা ছাড়াই পাকিস্তানে প্রবেশ করা যায়। ইমরানের ছেলেরা অবশ্য বলেছেন, তাঁদের পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং সেগুলো নবায়ন করা হয়নি।
ইমরান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। বর্তমানে ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতির মামলায় তিনি আদিয়ালা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৯ মে সংঘটিত বিক্ষোভের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন।
এর আগে গত ২৬ মার্চ জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে কাসিম খান তাঁর বাবার মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইমরানকে দীর্ঘদিন একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
কাসিম বলেন, বাবার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখেও তাঁদের পক্ষে নীরব থাকা সম্ভব নয়।
Comments