মাটির চোখ
খড়ের কাঠামোয় প্রথম মাটির প্রলেপ পড়ার শব্দ — থপ্ থপ্ — নিখিলের কানে বাজে এখনো, যদিও হাত এখন থেমে আছে। সামনে দুর্গার মুখ, চোখ দুটো ফাঁকা। পেছনে, দরজার কাছে, মিতালির ব্যাগ গোছানোর শব্দ। চেন টানার শব্দ, তারপর থেমে যাওয়া, তারপর আবার।
সে ভাবছিল কতক্ষণ ধরে যে এই মেয়েটার ব্যাগ গোছানোর শব্দটাও তার মুখস্থ হয়ে গেছে, ঠিক যেমন মুখস্থ ছিল তার স্ত্রীর কাঁচের চুড়ির শব্দ, ছাব্বিশ বছর আগে, যে শব্দটা একদিন হঠাৎ থেমে গিয়েছিল আর আর ফেরেনি।
"দাদু, চা।"
মিতালি ভাঁড় রাখে টুলে। নিখিল হাত বাড়ায় না সাথে সাথে। মাটি-মাখা আঙুল দুটো ঘষে দেখে, যেন সময় নিচ্ছে কিছু একটা লুকোনোর জন্য।
"এবার কার মুখ বসাচ্ছ?"
"দেখা যাক।"
মিথ্যে না উত্তরটা, কিন্তু সত্যিও না পুরোপুরি। কারণ সে জানে। গত রাতে ঘুমাতে না পেরে সে ভেবেছিল — যদি এই বছর মিতালির চোখ না বসায়, যদি অন্য কারো মুখ বসায়, তাহলে কি মেয়েটা থেকে যাবে এই শহরে? কুসংস্কার, সে নিজেই জানে, কিন্তু বুড়ো মানুষের মাথায় এমন সব হিসেব ঢুকে পড়ে যেগুলো দিনের আলোয় হাস্যকর শোনায়।
দুপুরে ইমেইলের প্রিন্টটা টেবিলে পড়ে থাকে। নিখিল সেটা তিনবার পড়েছে, যদিও একবার পড়েই বুঝেছিল সব।
"ভালো তো," সে বলে। "মিষ্টি খাওয়াবি কবে?"
"তুমি কিছু বলবে না, দাদু?"
"কী বলব?"
কথাটা বলেই সে টের পায় নিজের গলার সুরে একটা কাঠিন্য, যেটা সে চায়নি। মিতালি একটু পিছিয়ে যায়, যেন গায়ে লেগেছে।
সে জানালার কাছে যায়। বাইরে বাঁশ বাঁধার শব্দ। ভেতরে একটা কথা জমে ওঠে গলার কাছে — তুই চলে গেলে আমার আর কে থাকবে — কিন্তু সে কথাটা বলে না, কারণ বলা মানে স্বীকার করা যে সে চায় মেয়েটা থাকুক, নিজের জন্য, তার নিজের একাকীত্ব ভাঙানোর জন্য। এটা স্বার্থপরতা, সে জানে, আর স্বার্থপর হতে তার লজ্জা করে।
তাই বলে অন্য কিছু। "তোর ঠাকুমা যখন গিয়েছিল, তখনও প্রতিমা গড়ছিলাম। সেবার একটা চোখ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল।"
এটা সত্যি না পুরোপুরি। চোখ বাঁকা হয়নি সেবার। সে ইচ্ছে করে বাঁকা করেছিল, রাগের চোটে, কারণ স্ত্রী মারা যাওয়ার তিনদিন পর তাকে কাজে বসতে হয়েছিল খদ্দেরের চাপে, আর সে ঘৃণা করছিল প্রতিমাটাকে, ঘৃণা করছিল নিজের হাতকে যেটা তখনও কাজ করে যাচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। পরে রাতে একা বসে ঠিক করে দিয়েছিল চোখটা। কেউ জানত না।
এই গল্পটা সে মিতালিকে বলে না পুরোটা। শুধু আধখানা, যতটা বলা যায়।
মহালয়ার আগের রাত। চোখ আঁকার রাত।
মিতালি পাশে বসে, খাতা কোলে, কিন্তু লিখছে না। "আমাকে শিখিয়ে দাও।"
"কী?"
"চোখ আঁকা।"
নিখিলের হাত এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় তুলি ধরে। এই মুহূর্তে তার মনে হয় — যদি সে শিখিয়ে দেয়, তাহলে কি এটা একরকম স্বীকৃতি হয়ে যাবে যে মেয়েটা সত্যিই চলে যাচ্ছে, আর ফিরবে না এভাবে যেভাবে ছিল? শেখানো মানে তো একরকম বিদায়ও।
"এটা এক রাতে শেখার জিনিস না।"
"তাহলে কবে শিখব?"
"শিখবি না।" কথাটা বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে তীক্ষ্ণ হয়ে, যতটা সে চেয়েছিল তার চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ। মিতালি তাকায় তার দিকে, অবাক হয়ে। নিখিল নিজেও একটু থমকায় নিজের গলার আওয়াজে।
"কারণ," সে নরম করে বলার চেষ্টা করে, "তুই যে জীবনে যাচ্ছিস, সেখানে এসবের দরকার নেই।"
"এটা কি তোমার সিদ্ধান্ত?"
প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু এর ভেতর একটা কাঁটা আছে যেটা নিখিল টের পায়। সে চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ, তুলি ডোবায় রঙে, তোলে, আবার ডোবায় — সময় কেনার চেষ্টা।
"না," শেষে বলে। "সিদ্ধান্ত তোর। শুধু... আমি জানি না আমি কেন চাইছি তুই না শিখিস। হয়তো ভয়ে।"
"কীসের ভয়?"
"যে তুই শিখলে, তুই থেকে যাবি। আর থেকে গেলে একদিন আমার মতো হয়ে যাবি — একটা ঘরে বসে মাটি মাখাচ্ছিস, আর বাইরের পৃথিবী তোকে ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছে।"
এই স্বীকারোক্তির পর ঘরে নীরবতা নামে, শুধু ঢাকের মহড়ার ভাঙা তাল বাইরে থেকে ভেসে আসে। মিতালি কিছু বলে না প্রথমে। তারপর হাত বাড়ায়, তুলিটা ছুঁতে চায়।
"তাহলে আমাকে দাও। ভয়টা আমার হোক, তোমার না।"
নিখিল তুলি দেয় না তখনই। বরং নিজের হাতে বাঁ চোখটা শেষ করে — টানা, লম্বাটে, ভেতরে সাদা রঙের ছোঁয়া। তারপর, প্রায় নিজের অজান্তেই, ডান চোখের জায়গায় তুলি ধরিয়ে দেয় মিতালির হাতে।
"ভুল করলে ঠিক করে দেব," বলে সে। "প্রথমবার কেউ ঠিক আঁকে না।"
মিতালির হাত কাঁপে। রেখাটা প্রথমে বেঁকে যায় একটু, তারপর সে থামে, শ্বাস নেয়, আবার শুরু করে। নিখিল দেখে না তার দিকে, তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে, কারণ দেখলে হয়তো হাত বাড়িয়ে সংশোধন করে ফেলবে, আর সে জানে এই মুহূর্তে সংশোধন করাটা ভুল হবে।
চোখটা শেষ হয় অসম্পূর্ণ, একটু বাঁকা — বাঁ চোখের চেয়ে সামান্য উঁচু।
"বাঁকা হয়ে গেছে," মিতালি বলে, প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায়।
নিখিল তাকায় এতক্ষণে। দেখে। "হ্যাঁ," বলে। "রেখে দে।"
"ঠিক করবে না?"
"না।"
মহালয়ার সকাল। রেডিওতে চণ্ডীপাঠ। দুর্গা প্যান্ডেলে চলে গেছে গতকাল রাতেই, বাঁকা চোখ নিয়ে।
ঘরটা ফাঁকা লাগে। মেঝেতে মাটির গুঁড়ো। নিখিল বারান্দায় বসে, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে হাতে। মিতালি ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসে, কিন্তু বসে না তার পাশে সরাসরি — একটু দূরত্ব রাখে, যেটা আগে কখনো ছিল না তাদের মধ্যে।
"তুমি রাগ করে আছ?"
"না।"
"তাহলে কী?"
নিখিল ভাঁড়টা নামায় রেলিং-এ। "লজ্জা পাচ্ছি। যা বলেছিলাম কাল রাতে।"
"লজ্জা পাওয়ার কী আছে? সত্যি বলেছিলে।"
"সত্যি বলাটাই তো লজ্জার। একটা বুড়ো মানুষ তার নাতনিকে বলছে যে সে চায় না মেয়েটা এগিয়ে যাক, শুধু নিজের একলা থাকার ভয়ে — এটা কি গর্বের কথা?"
মিতালি এবার কাছে আসে, বসে তার পাশে। "আমি ফিরব, দাদু। কিন্তু তুমি যদি চাও আমি না যাই..."
"না।" নিখিল দ্রুত বলে, প্রায় নিজেকে থামানোর আগেই। "না। ওটা বলিনি আমি। ভয়ের কথা বলেছি, চাওয়ার কথা না। দুটো আলাদা।"
মিতালি তার হাত ধরে। কিছু বলে না।
"তুই যা," নিখিল আবার বলে, কিন্তু এবার গলায় আগের মতো নিশ্চিন্ততা নেই, একটা ফাটল আছে যেটা সে লুকোতে পারছে না।
প্যান্ডেলে ভিড়। দুর্গা দাঁড়িয়ে তার পূর্ণ রূপে। মানুষ প্রণাম করছে, ছবি তুলছে। কেউ খেয়াল করছে না ডান চোখটা সামান্য বাঁকা, বাঁ চোখের চেয়ে সামান্য উঁচু — শুধু কাছ থেকে দেখলে চোখে পড়ে।
একজন মহিলা পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে সঙ্গীকে, "এবারের প্রতিমার চোখে যেন কী একটা আছে, না? অন্যরকম।"
মিতালি শোনে কথাটা, তাকায় দাদুর দিকে। নিখিল কিছু বলে না, শুধু ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ দুর্গার মুখে স্থির।
সে ভাবে — এই বাঁকা চোখ থেকে যাবে দশমী পর্যন্ত, তারপর বিসর্জন হবে গঙ্গায়, মাটি মিশে যাবে জলে। মিতালিও চলে যাবে, ফিরবে হয়তো, নাও ফিরতে পারে ঠিক আগের মতো। কোনটা বেশি ভয়ের, সে ঠিক বুঝতে পারে না — মাটির বিসর্জন, না মানুষের বদলে যাওয়া।
"দাদু," মিতালি বলে, হাত শক্ত করে ধরে, "তুমি ঠিক থাকবে তো?"
নিখিল উত্তর দেয় না সাথে সাথে। ঢাক বাজতে থাকে, ধুনোর ধোঁয়া উঠে যায় ওপরে, চালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় শরতের আকাশ, যেখানে মেঘ ভেসে যাচ্ছে, কোনো তাড়া ছাড়াই, কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই কোথায় গিয়ে থামবে।
"জানি না," শেষে বলে সে। "দেখা যাক।"
Comments