বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে কেমন ছিল বাংলাদেশ?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যায় ভয়াবহ এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ভোরে সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন। একই রাতে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হন।
তবে ১৫ আগস্টের সেই ঘটনার আগে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির। হত্যাকাণ্ডের আগের কয়েক সপ্তাহে অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, লুটপাট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক বিরোধ এবং সেনাবাহিনীর ভেতরের অসন্তোষ; সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল।
দুর্নীতি ও লুটপাটে ক্ষোভ
স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী চুরি, সরকারি গুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচার এবং চোরাচালানের অভিযোগ তখন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত উঠে আসছিল।
দুর্নীতি ও চোরাচালান ঠেকাতে সরকার সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায়। কিন্তু অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাসদস্যদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরোধ তৈরি হয়। পরে সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
জুলাইয়ের শেষদিকে সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যশস্য লুটের ছবি প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে খাদ্যশস্য পরিবহনের পথে বড় ধরনের অনিয়ম ও পাচারের খবরও প্রকাশিত হয়।
অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা
দুর্ভিক্ষের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ক্রমে খারাপ হতে থাকে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা বাড়ছিল। ট্রেন ও লঞ্চেও ডাকাতির খবর পাওয়া যাচ্ছিল।
১১ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদীগামী ট্রেনে ডাকাতির কথা বলা হয়। ডাকাতদের বাধা দিতে গেলে তারা গুলি চালায়। এতে দুই যাত্রী নিহত এবং অন্তত ২২ জন আহত হন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে অভিযান
১৯৭৫ সালের শুরু থেকেই বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে সরকারের সংঘাত বাড়ছিল। সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারের মৃত্যুর পর সংগঠনটির তৎপরতা আরও সহিংস হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও রক্ষী বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় অভিযান জোরদার করে।
অভিযানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে চরমপন্থিদের নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হচ্ছিল। ১৩ আগস্ট, অর্থাৎ ১৫ আগস্টের মাত্র দুই দিন আগে, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অভিযানে চার চরমপন্থি নিহত ও একজন গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
খরা-বন্যায় বিপর্যস্ত কৃষি
১৯৭৪ সালের খাদ্যসংকটের প্রভাব তখনো কাটেনি। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছিল। অনেক কৃষক সেই উদ্যোগে সাড়া দিলেও পরে খরায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জুলাইয়ের শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির অভাবে আউশ ধানের গাছ শুকিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এরপর হঠাৎ অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকা বন্যাকবলিত হয়। এতে ফসল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটে। বন্যার পর পানিবাহিত রোগ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দেয়।
সেনাবাহিনীতে বাড়ছিল অসন্তোষ
তৎকালীন সেনাবাহিনীর ভেতরেও নানা বিষয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তরুণ কিছু সেনা কর্মকর্তা মনে করতেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের চাপের কারণে সেনাবাহিনীকে দুর্নীতি ও চোরাচালানবিরোধী অভিযান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে একদলীয় শাসনব্যবস্থা নিয়েও সেনাবাহিনীর একটি অংশের আপত্তি ছিল। রক্ষী বাহিনীকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়েও সেনাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এমনকি সেনানিবাসে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে রক্ষী বাহিনীকে শক্তিশালী করা হবে।
পাশাপাশি কয়েকজন তরুণ সেনা কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনাও অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয় বলে স্মৃতিকথায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকায় শেখ মুজিবও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেন। জুলাইয়ের শেষদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযান শুরু হয়। সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেপ্তারের খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে থাকে।
১ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে টিসিবির তিন কর্মকর্তাকে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। অভিযোগ ছিল, ভুয়া ব্যাংক রসিদের মাধ্যমে সরকারি অর্থের সমমূল্যের সিমেন্ট তুলে বিক্রি করা হয়েছিল।
এর আগে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা
এর মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরকার উৎখাত ও শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু করে। এই পরিকল্পনায় মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানের নাম গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসে। পরে তিনি মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বিভিন্ন স্মৃতিকথা অনুযায়ী, দেশের দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ফারুকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
১২ আগস্ট রাতে আলোচনার পর ১৫ আগস্টকে অভ্যুত্থান বাস্তবায়নের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয় বলে এম এ হামিদের বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
পরিকল্পনার সঙ্গে মেজর শরীফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, আজিজ পাশা ও সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানসহ কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা যুক্ত হন। পরে ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাও এতে অংশ নেন।
মোশতাকের সঙ্গে যোগাযোগ
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীরা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন। তাঁদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
২ আগস্ট মেজর রশিদ তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শেখ মুজিবকে উৎখাত ও হত্যার পর মোশতাক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেবেন—এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথাও আলোচনায় ছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যার আগের দিন রেকি
১৫ আগস্টের আগের দিন, অর্থাৎ ১৪ আগস্ট, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবন ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। তদন্তে দেওয়া সাক্ষ্যে মেজর ডালিমকে ওই এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখার কথা বলা হয়। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকেও সেদিন ধানমন্ডি এলাকায় দেখা যায় বলে তদন্তে উঠে আসে।
রাতে নিয়মিত সামরিক মহড়ার কথা বলে ট্যাংক, অস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে সেনানিবাসে জড়ো হন অভ্যুত্থানকারী কর্মকর্তারা। এরপর তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।
পরদিন ভোরে শুরু হয় সেই অভিযান। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
নিরাপত্তার বড় ঘাটতি ছিল ৩২ নম্বরে
পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল তুলনামূলক দুর্বল। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তাকর্মীদের কাছেও পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ছিল না।
অন্যদিকে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। কারণ সকালে সেখানে শেখ মুজিবের যাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
এর আগেও হয়েছিল হামলার চেষ্টা
১৫ আগস্টের আগে শেখ মুজিবের ওপর হামলার আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল বলে পরে প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। ২১ মে ১৯৭৫ টেলিভিশন স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল। শেখ মুজিব অক্ষত থাকলেও ওই ঘটনায় দুজন আহত হন।
তবে হামলার ঘটনাটি তখন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশ না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও ওই নথিতে উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে ১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ রাত আসে। বিদেশে অবস্থান করায় শেখ মুজিবের দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালনের দিন হিসেবে পালন করা হয়েছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরবর্তী সময়ে ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়।
সূত্র: বিবিসি
Comments