থানা ভবন যেন মৃত্যুফাঁদ, ধসে পড়ার আশঙ্কা
চাঁদপুরের হাইমচর থানা ভবন এখন যেন পুলিশ সদস্যদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং একটি সম্ভাব্য মৃত্যুফাঁদ। ভবনের বীম ও কলামে বড় বড় ফাটল, রডে মরিচা, ছাদে দীর্ঘদিনের পানি জমে থাকা, শেওলা ও ছোট গাছ জন্ম নেওয়াসহ নানা কারণে ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় ভবনের কোনো অংশ ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা।
হাইমচর উপজেলার প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার মানুষের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনেই বসবাস ও দায়িত্ব পালন করছেন। ভবনটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সরেজমিনে হাইমচর থানা ভবন পরিদর্শন করে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন বীমে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে। ছাদে পানি জমে সেখানে ছোট ছোট গাছ ও শেওলা জন্মেছে। ভবনের অধিকাংশ দেয়াল ও ছাদে দেখা গেছে ব্যাপক ড্যাম্প। দীর্ঘদিনের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন অংশে শেওলা জমে ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ভবনের দুই পাশে থাকা দুটি সিঁড়ির বিভিন্ন অংশেও দেখা গেছে ফাটল। রডে মরিচা ধরে কংক্রিটের অংশ ফেটে বেরিয়ে এসেছে। বারান্দার প্রায় সব কলামেই রডে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও মরিচাজনিত কারণে কংক্রিট খসে পড়ে কলামে দৃশ্যমান হয়েছে ফাটল।
থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দায়িত্ব পালন শেষে বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও তাদের মনে স্বস্তি নেই। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনায় তারা সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকেন।
এএসআই হান্নান বলেন, 'ডিউটির পর আমরা যখন থানা ভবনে ফিরে বিশ্রাম নিতে যাই, তখনও সবসময় আতঙ্কে থাকি। কখন যে ভবনটি ধসে পড়ে, সেই ভয় কাজ করে। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এখন ভবনের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তা করতে হয়।'
এএসআই সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'পুরো ভবনের বিভিন্ন স্থানে এমনভাবে ফাটল ধরেছে যে সামান্য ঝড় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা ডিউটি করে এসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমাতে গেলেও ভবন ধসে পড়ার চিন্তায় পুরোপুরি ঘুমাতে পারি না।'
এসআই সমীর দাস বলেন, 'তীব্র গরমেও আমরা অনেক সময় ফ্যান চালাতে পারি না। কয়েকবার সিলিং ফ্যান খুলে পড়ে আগে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ কারণে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ফ্যান না চালিয়ে থাকতে হয়।'
হাইমচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, হাইমচর একটি নদীভাঙনপ্রবণ উপজেলা। ১৯৯৮ সালের দিকে নদীভাঙনের কারণে তাড়াহুড়ো করে থানা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ভবন নির্মাণের সময় যথাযথ মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনটি নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, 'আমাদের পুলিশ স্টেশনে প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জনের বেশি সদস্য থানা ভবনে অবস্থান করেন। ভবনটির বর্তমান অবস্থায় আমরাও সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় থাকি। দ্রুত একটি নিরাপদ ভবন প্রয়োজন।'
হাইমচর ফায়ার স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, তিনি থানা ভবনটি পরিদর্শন করেছেন। ভবনের বিভিন্ন স্থানে যে ধরনের ফাটল দেখা গেছে, তাতে সামান্য ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, থানা ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটলের বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগ ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাইমচরবাসীর জন্য পুলিশের সেবাও আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
চাঁদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসিম আহমেদ টিটো বলেন, দুই তলা থানা ভবনটি ১৯৯৮ সালে বক্স টাইপ প্ল্যানে ব্রিক স্ট্রাকচারে নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির অধিকাংশ দেয়াল ও ছাদে ড্যাম্প রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে শেওলা জমেছে। দুই পাশের সিঁড়ির বিভিন্ন অংশে রডে মরিচা ধরে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবনের বারান্দার প্রায় সব কলামে রডে মরিচা ধরেছে এবং মরিচাজনিত কারণে ফাটল দেখা দিয়েছে। বেশ কিছু বীমেও ফাটল রয়েছে। ছাদে পানি জমে ছোট গাছ ও শেওলা জন্মেছে। অতিমাত্রায় ড্যাম্পনেসের কারণে বীম, কলাম, ছাদসহ ভবনের প্রায় প্রতিটি অংশের রড মরিচায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নাসিম আহমেদ টিটোর ভাষ্য, 'মেরামতের মাধ্যমে ভবনটি অল্প সময়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য করা গেলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।' এ বিষয়ে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। এখন ভবনটি মেরামত করা হবে, নাকি নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে-সে বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার সিদ্ধান্ত নেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সদস্যদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনটি দ্রুত পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সেখানে নতুন থানা ভবন নির্মাণ করা হোক। তাদের মতে, নতুন ভবন নির্মিত হলে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি থানার কার্যক্রমও নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে হাইমচরের সাধারণ মানুষও আরও নিরাপদ ও উন্নত পুলিশি সেবা পাবেন।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা এই ভবন নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে- কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কি নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, নাকি দুর্ঘটনার পরই কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? পুলিশ সদস্য ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
Comments