চার ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা
দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং সম্পূর্ণ আর্থিক সক্ষমতা হারানো ৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে গ্রাহকদের জমানো টাকা কীভাবে এবং কবে ফেরত পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে। এই উদ্দেশ্যে সরকার সংকটাপন্ন এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য প্রায় ২ হাজার ৭শ কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন আইনের আওতায় অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে এমন চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, একটি ফাইন্যান্স কোম্পানি, একটি লিজিং প্রতিষ্ঠান, দুটি বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া আরও একটি লিজিং প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের তালিকায় রাখা হলেও আদালতের মাধ্যমে পর্ষদ নিযুক্ত থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেখানে প্রশাসক বসানো হবে। পাশাপাশি, পরিস্থিতি শুধরে নেওয়ার জন্য আরও চারটি সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান বন্ধ মানেই গ্রাহকদের টাকা হারিয়ে যাওয়া নয়। আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সম্পদ ও দায়ের হিসাব কষে তিন ধাপে অর্থ ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রথম ধাপ (সরকারি বিশেষ বরাদ্দ): ব্যক্তি আমানতকারীদের জন্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বীমার নির্ধারিত সীমা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাঁর হিসাবে ১০ লাখ বা তার কম জমা আছে, তিনি পুরো টাকাই প্রথম ধাপে পেয়ে যাবেন।
যাঁর জমা ১০ লাখের বেশি (যেমন: ২৫ লাখ বা ১ কোটি টাকা), তিনি প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা পাবেন। বাকি অংশ পরবর্তী ধাপে যাবে।
দ্বিতীয় ধাপ (সম্পদ ও ঋণ আদায়): প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ (জমি, ভবন, বিনিয়োগ) মূল্যায়ন করে বিক্রি এবং বছরের পর বছর অনাদায়ী থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
তৃতীয় ধাপ (আইনি অগ্রাধিকার বণ্টন): উদ্ধার হওয়া অর্থ আইনি অগ্রাধিকার অনুযায়ী বণ্টন করা হবে, যেখানে সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বড় অঙ্কের আমানতকারীদের (যাঁদের জমা ১০ লাখ টাকার বেশি) বাকি টাকা পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ কতটা সফলভাবে আদায় করা যায় এবং সম্পদ বিক্রি করে কত অর্থ ওঠে তার ওপর। ফলে তাঁদের কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় তেরো হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত রয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা (বাকি অর্থ অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের)। প্রতিষ্ঠানভেদে ব্যক্তি আমানতের পরিমাণে তারতম্য থাকলেও, সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক সামলানোর মতো পর্যায়ে থাকায় প্রথম ধাপেই তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আমানতকারীদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি পরামর্শ: আতঙ্কিত না হয়ে আমানতের সনদ, জমার রসিদ এবং হিসাব বিবরণীসহ সব নথিপত্র গুছিয়ে রাখুন। নিজের পাওনার সঠিক হিসাব মিলিয়ে রাখুন।কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রলোভনে পড়ে দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে বিশ্বাস করবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসমর্থিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা প্রশাসকদের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার ওপর ভরসা রাখুন।
অকার্যকর ঘোষণার পেছনের কারণ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ: বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি, ভয়াবহ মাত্রায় শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ (গত বছরের শেষ নাগাদ যা প্রায় ৯০ থেকে ১০০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল), তীব্র তারল্য সংকট এবং আয়ক্ষমতার ক্রমাগত অবনতির কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।
এই পুরো উদ্যোগের সফলতা মূলত: নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর: ১. আমানতকারীদের প্রথম ধাপের অর্থ কত দ্রুত হাতে পৌঁছায়। ২. অনাদায়ী ঋণ কত কঠোরভাবে ও কার্যকরভাবে আদায় করা যায়। ৩. সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়।
নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা গেলে এই সিদ্ধান্ত আমানতকারীদের আস্থাসংকট কাটিয়ে ওঠার একটি বড় উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Comments