গ্যাস সংকটে থমকে যাচ্ছে দেশ: দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটের সতর্কবার্তা
দেশজুড়ে প্রায় এক মাস ধরে চলমান গ্যাস সংকট এখন আর শুধু একটি জ্বালানি সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে অর্থনীতি, শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রান্নার চুলায় গ্যাস না থাকা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়া, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা-সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অর্থাৎ কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেশের প্রতিটি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাসনির্ভর অর্থনীতিতে এমন ঘাটতি দীর্ঘ সময় অব্যাহত থাকলে তার প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের বিকল হয়ে যাওয়া। গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই টার্মিনাল কার্যত বন্ধ থাকায় আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। মেরামতের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হলেও এটি কবে পুরোপুরি সচল হবে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। ফলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করাও সরকারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোথাও একদিনেই বহুবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ছোট উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্প খাতেরও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও ফতুল্লার মতো শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপের পরিবর্তে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই প্রয়োজন। ফলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও সিরামিক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছাতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ব্যয়ে বিমানপথে রপ্তানি করছে। আবার অনেক কারখানা উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে শুধু উদ্যোক্তারাই নন, হাজার হাজার শ্রমিকের আয়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পরিবহন খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন নিয়মিত দৃশ্য। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে সড়কে সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনছেন। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেটিও কার্যকর সমাধান হয়ে উঠছে না। অর্থাৎ গ্যাস ও বিদ্যুতের দ্বৈত সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, শুধু আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এলএনজি অবকাঠামোর নিরবচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
গ্যাস সংকট যদি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না যায়, তবে এর প্রভাব শুধু শিল্প ও অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। তাই বর্তমান সংকটকে কেবল একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
Comments