রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু?
মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৫টায় সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর এখন সবার দৃষ্টি পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন সেদিকে। সরকার গঠনের পর থেকেই এ পদে বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় আসছে। সাধারণ মানুষও সামাজিক মাধ্যমে তাদের পছন্দের কথা জানাচ্ছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রপতির আসলে ক্ষমতা কতটুকু? এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন রাজনৈতিক ও জনপরিসরের আলোচনায় বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। যেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এখন ক্ষমতায়, তাই সে আলোচনা আরও বেশি। চুপ্পু আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং তাকে দিয়ে মৌলিক কাজগুলো বিএনপি করিয়ে নিয়ে এখন নিজের পছন্দের কাউকে আনবে। দল থেকে নাকি নাগরিক সমাজ থেকে নতুন রাষ্ট্রপতি আসবেন, সেটা সময়ই বলে দেবে।
সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অসীম ক্ষমতা রাখার জন্য। সংসদীয় পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতির নামেই রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ড চলে। সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করবেন। রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু তিনি সরকারপ্রধান নন।
বলা হয়ে থাকে, রাষ্ট্রপতি দুটি স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে—রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। প্রধান বিচারপতি কে হবেন, তা নির্ধারণ করা এবং তাঁকে নিয়োগ করার ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের বাইরে তিনি কোনোভাবেই যেতে পারেন না।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন। সংসদ নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে, সেই দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে হয়। এটাও ঠিক স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ নয়; কারণ এ ছাড়া কোনো অপশনও থাকে না। তবে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে, তখন কোনো দলের জোট থেকে কে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাবেন, তা রাষ্ট্রপতিই নির্ধারণ করবেন।
রাষ্ট্রপতির পরোক্ষ কিছু ক্ষমতা আছে। রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করলে যেকোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী পেশ করবেন। এই পরোক্ষ ক্ষমতার কথা বলা আছে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৫ নম্বর দফায়। পরোক্ষ ক্ষমতার বিষয়টি দেখলে মনে হবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনেক, আসলে তা নয়।
প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ—এই দুটি কাজের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির কারও পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোনো দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা নেই। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া বাকি সব দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।
একই সঙ্গে সংবিধানে এমন শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না, কিংবা পরামর্শ দিয়ে থাকলে তা নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
সংবিধানে বলা হয়েছে, সংবিধান ও অন্য কোনো আইনের দ্বারা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া ও অর্পিত সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করবেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত বিষয় রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।
রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এর সমর্থনে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিয়েছে, কিন্তু তা আলোচনাতেই রয়ে গেছে।
কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া যেকোনো দণ্ডের মার্জনা বা ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতিকে সংবিধানে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বলতে গেলে এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা।
রাষ্ট্রপতিকে তাঁর দায়িত্বের ব্যাপারে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। তাঁকে গ্রেপ্তারের বা কারাগারে নেওয়ার জন্য কোনো আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যাবে না। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে তাঁর সকল কার্যক্রমের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
Comments