হামের শীর্ষে বাংলাদেশ: টিকার সংকট থেকে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়
অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের আমলে টিকার যে সংকট তৈরি করা হয়েছিল তার মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশ। হামে শিশু মারা যাচ্ছে এবং তা হাজারের দিকে ছুটছে। আক্রমণের শিকার লাখ ছাড়িয়েছে।
একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বের কাছে উদাহরণ ছিল। হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগকে নিয়ন্ত্রণে এনে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছিল-দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসন এবং জনসম্পৃক্ততা থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও অসাধারণ সাফল্য অর্জন সম্ভব। কিন্তু আজ সেই বাংলাদেশই হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মুখে দাঁড়িয়ে। যে রোগকে প্রায় ভুলে গিয়েছিল মানুষ, সেটিই আবার জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
এ সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, নিয়মিত টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও কয়েক বছরের মধ্যে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ডেকে আনতে পারে। কারণ হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একটি আক্রান্ত শিশু থেকে আরও বহুজন আক্রান্ত হতে পারে। তাই এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এই সুরক্ষাবলয় ভেঙে গেলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত মে মাসে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করছে। আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, মৃত্যুও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা-বিশেষ করে যারা টিকার কোনো ডোজই পায়নি। অর্থাৎ সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে টিকাদানের ঘাটতি।
এই পরিস্থিতির জন্য বেশি দায়ী অধ্যাপক ইউনূস। তার সরকারের আমলেই টিকা সংগ্রহে গাফিলতি ছিল। টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব ব্যবস্থায় বিলম্ব, নীতিগত পরিবর্তন বা প্রশাসনিক দুর্বলতা ভবিষ্যতে বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে। যদি কোনো সময় টিকা সংগ্রহে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, যার ফলে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে বা কাভারেজ কমে গেছে, তবে সেই সিদ্ধান্তগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে বর্তমান সরকারের দায়িত্বও কম নয়। শুধু অতীতের ব্যর্থতার কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; এখন সবচেয়ে জরুরি হলো যেসব শিশু এখনও টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণের পরও লক্ষ লক্ষ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি কেবল পরিসংখ্যানগত ত্রুটি নয়; বরং পরিকল্পনা, তথ্যব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। একটি শিশু টিকা না পেলে শুধু সে নয়, তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং পুরো সমাজই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। ক্ষমতায় কে আছে বা কে ছিল—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশের প্রতিটি শিশুর জীবন কী যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে? হামে একটি শিশুর মৃত্যুও প্রতিরোধযোগ্য। তাই প্রতিটি মৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারণের জন্য কঠিন আত্মসমালোচনার বিষয় হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের সামনে এখনও সুযোগ আছে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার। প্রয়োজন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, টিকার সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো এবং যেসব শিশু বাদ পড়েছে তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে টিকা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি টিকা-সংক্রান্ত সব নীতিগত সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে গ্রহণ করতে হবে।
হামের এই প্রাদুর্ভাব আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে-জনস্বাস্থ্যে অবহেলার মূল্য অনেক বড়। একটি দেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থবহ, যখন তার শিশুরা নিরাপদ থাকে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে সেই শিশুদের ওপর। তাই টিকাদানকে আবারও জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
Comments