লালদিয়া টার্মিনালে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের ডেনিশ বিনিয়োগ: অপারেশনে যাচ্ছে ২০৩০ সালে
চট্টগ্রামে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। এপি মোলার–মার্স্কের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের গ্রাউন্ডব্রেকিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (PPP) প্রকল্প নির্মাণপর্বে প্রবেশ করল।
৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের সরকারি পর্যায়ের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এপিএম টার্মিনালস।
গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
অনুষ্ঠানে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড, এপিএম টার্মিনালস বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লিমেন্টেশন জ্যাক ক্রেগ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামান, বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বছরে ৮ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে চালু হওয়ার পর লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা যুক্ত করবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গভীর ড্রাফট ও বর্ধিত জেটির মাধ্যমে টার্মিনালটিতে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা করা যায়।
বড় জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতার ফলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় ও লজিস্টিকস ব্যয় কমার পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মালিকানায় থাকবে বন্দরের সম্পদ
প্রকল্পটির নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে এপিএম টার্মিনালস ও এর অংশীদারদের ওপর। তবে বন্দরের সম্পদের মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দর খাতে এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরনের PPP মডেল।
এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড বলেন, লালদিয়ার গ্রাউন্ডব্রেকিং একটি প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সূচনা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য গভীর পানিপথ, বড় জাহাজ পরিচালনা, পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম ও বিশ্বমানের বাণিজ্যিক অবকাঠামো তৈরি হবে।
তৈরি হবে হাজারো কর্মসংস্থান
প্রকল্পটির নির্মাণপর্বে ১ হাজারের বেশি এবং পরিচালনপর্বে ৫০০-এর বেশি সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি লজিস্টিকস, উৎপাদন ও সেবা খাতেও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। স্থানীয় জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচিও চালু করা হবে।
পরিবেশবান্ধব বন্দর হিসেবে লালদিয়াকে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। বৈদ্যুতিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও শোর-পাওয়ার সুবিধার মাধ্যমে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, শব্দ ও বায়ুদূষণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকার আশা
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রামকে শুধু জাতীয় বন্দর হিসেবে নয়, একটি আঞ্চলিক লজিস্টিকস হাবে রূপান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণের কারণে স্থানীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ সহায়তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে বিনিয়োগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও টেকসই সমৃদ্ধির প্রতি ডেনমার্কের আস্থার প্রতিফলন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত—এমন একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামান বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর ও বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতে ঐতিহাসিক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। PPP-এর আওতায় ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেলে নির্মিতব্য এই প্রকল্প টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক বন্দর উন্নয়নে নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এপিএম টার্মিনালস বিশ্বের ৩৩টি দেশে ৬০টির বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি এপি মোলার–মার্স্ক গ্রুপের অংশ, যা বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
Comments