আজাদ কাশ্মির:পাকিস্তানের নতুন সংকট
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার সংগ্রাম, অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা-এই দুই সংকটের পাশাপাশি এবার নতুন করে অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে আজাদ কাশ্মির। যে অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান তার কাশ্মির নীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে,সেখানেই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বলতাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান আজাদ কাশ্মির ও গিলগিট-বাল্টিস্তানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে অঞ্চল দুটিতে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো থাকলেও সমালোচকদের মতে,প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সামরিক নেতৃত্বের হাতেই থেকে গেছে। আজাদ কাশ্মিরের ৪৫ সদস্যের বিধানসভার মধ্যে ১২টি আসন ভারতের জম্মু-কাশ্মির থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত। বলা হচ্ছে এটি একটি রাজনীতি। কারণ এর মাধ্যমে ভারতে জম্মু ও কাশ্মিরে উসকানি অব্যাহত রাখা যায়। এই সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা বাতিল,কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের দাবিতে ৫ জুন থেকে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি আন্দোলন শুরু করে।
গত ৯ জুনের হরতালকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে পুলিশ ও আন্দোলনকারী-উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে সরকারকে দাবি বাস্তবায়নের জন্য ১৪ জুলাই পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। তবে আলোচনার পরিবর্তে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুজাফফরাবাদ, রাওলাকোট ও কোটলিতে আধাসামরিক বাহিনী ও ফেডারেল পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে,গুলি ও পেলেট ব্যবহারের ফলে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে অঞ্চলটিকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এই পরিস্থিতির পেছনে কেবল রাজনৈতিক দাবি নয়,দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি,খাদ্যসংকট,বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণে কর বৃদ্ধি ও ভর্তুকি কমানোর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে জনঅসন্তোষ ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও পাকিস্তান এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। বেলুচিস্তানে বিএলএ, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় টিটিপি এবং এখন আজাদ কাশ্মিরে গণআন্দোলন-এই তিনটি ভিন্নধর্মী সংকট একসঙ্গে সামাল দেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা দুর্বল হওয়ায় তারা সংলাপের পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগের পথকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মিরকে পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সীমান্তপারের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানের কাশ্মির-সংক্রান্ত নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
কিছু বিশ্লেষক বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার তুলনাও টেনে এনেছেন। যদিও দুই প্রেক্ষাপট এক নয়, তবু তারা মনে করেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জনমতের প্রতি উপেক্ষা যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য গভীর সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তাই বলপ্রয়োগের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে।
আজাদ কাশ্মিরের চলমান পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি আঞ্চলিক অস্থিরতা নয়; এটি দেশটির সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা,শাসনব্যবস্থা এবং কাশ্মির নীতির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রকৃত রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগণের অংশীদারত্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় এই সংকট আরও বিস্তৃত হয়ে পাকিস্তানের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
Comments