নগর সরকার ছাড়া ঢাকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান অসম্ভব: মির্জা ফখরুল
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নাগরিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী ও কার্যকর সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশনগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ 'গভর্নমেন্ট' বা নগর সরকারে রূপান্তর করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজ বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নগর ভবনে আয়োজিত 'নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আমার, আপনার সকলের দায়িত্ব' শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সেমিনারে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ঢাকা শহরের টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি স্বশাসিত সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। তিনি বলেন:'সিটি করপোরেশনকে যদি এমন একটি স্বশাসিত সরকারে রূপান্তর করা না যায়—যা শহরের উন্নয়নসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবা সংস্থা ও বিভাগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করবে—তবে এই মেগাসিটির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান কখনোই সম্ভব হবে না।'
তিনি ঢাকার মূল নাগরিক ভোগান্তির কারণ হিসেবে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যকার চরম সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেন। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ ও সড়ক বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথকভাবে কাজ করায় উন্নয়ন কার্যক্রমে বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে এবং নাগরিকদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
পুরো প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত কঠিন বা একটি 'হারকিউলিয়ান টাস্ক' হিসেবে আখ্যায়িত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, রাতারাতি ঢাকাকে বদলে ফেলা সম্ভব নয়। এর পেছনে বহু প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে প্রকল্পের অর্থ ছাড় হওয়ায় বিভিন্ন সংস্থা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির প্রতিযোগিতায় নামে। এক সংস্থার কাজ শেষ হতে না হতেই অন্য সংস্থা রাস্তা কাটতে শুরু করে, যা চরম সমন্বয়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ। এই ধারা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একই লক্ষ্য নিয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে নাগরিকদের সচেতনতা ও আচরণগত পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দেন মন্ত্রী। "নিজের আঙিনা নিজেকেই পরিষ্কার রাখতে হবে—এই বোধ সবার মধ্যে জাগ্রত করা প্রয়োজন," বলেন তিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন থেকেই শিশুদের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক দায়িত্ব শেখানোর তাগিদ দেন। গণমাধ্যম, বিলবোর্ড ও প্রচারণার মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বস্তিসহ সব স্তরের মানুষের মাঝে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। দেশের দুর্বল মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকার জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে খাল ও জলাশয় দখলকে চিহ্নিত করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, অবশিষ্ট খালগুলো উদ্ধার এবং বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ রোধ করা না গেলে জলাবদ্ধতা কমানো অসম্ভব। বুড়িগঙ্গার বর্তমান দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি নদীগুলো পুনরুদ্ধারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
পরিশেষে, রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নাগরিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন:'আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা জামায়াত—এসব পরিচয়ের আগে আমরা বাংলাদেশকে দেখতে চাই। আমরা ঢাকাকে একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।'
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত পাঁচ দশকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক সেমিনার হয়েছে, এখন সময় বাস্তব পদক্ষেপের। "আমার শহর আমি পরিষ্কার রাখব"—এই মানসিকতা ধারণ করলেই কেবল একটি টেকসই ও পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব।
Comments