বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকলে করনীয়
টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল কিংবা আকস্মিক বন্যায় মুহূর্তেই তলিয়ে যেতে পারে ঘরবাড়ি। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। অথচ শুরুতেই নেওয়া কিছু সঠিক পদক্ষেপ প্রাণহানি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, পানিবাহিত রোগ এবং আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, বাড়িতে পানি ঢুকতে শুরু করলে সবার আগে নিচের ৭টি কাজ করা জরুরি:
১. জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন
আসবাবপত্র, টেলিভিশন বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী বাঁচানোর চেয়ে মানুষের জীবন বাঁচানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে বা স্থানীয় প্রশাসন এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিলে দেরি না করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিন।
২. নিরাপদ উপায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করুন
বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকলে এবং সম্ভব হলে ঘরের মূল বা মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন। তবে কোনো অবস্থাতেই পানিতে দাঁড়িয়ে বা ভেজা শরীরে বৈদ্যুতিক সুইচ স্পর্শ করবেন না। একই সাথে গ্যাসের মেইন লাইনও বন্ধ করুন। সুইচ বা মিটার পানির নিচে চলে গেলে নিজে ঝুঁকি না নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সহায়তা নিন।
৩. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ওষুধ সুরক্ষিত রাখুন
জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ব্যাংক ও জমির দলিলপত্র, নগদ টাকা, জরুরি ওষুধ, মোবাইল ফোন এবং পাওয়ার ব্যাংক একটি জলরোধী (ওয়াটারপ্রুফ) ব্যাগে ভরে ঘরের উঁচুতে রাখুন। সম্ভব হলে এসব গুরুত্বপূর্ণ কাগজের ডিজিটাল কপি বা ছবি আগে থেকেই ই-মেইল বা ক্লাউডে সংরক্ষণ করে রাখুন।
৪. বন্যার পানি এড়িয়ে চলুন
বন্যার পানিকে কখনোই নিরাপদ ভাববেন না। এই পানিতে নর্দমার বর্জ্য, ক্ষতিকর জীবাণু, রাসায়নিক, ধারালো কাচ বা লোহা এবং বিষাক্ত সাপ কিংবা পোকামাকড় থাকতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে পানিতে নামবেন না। জরুরি প্রয়োজনে নামতে হলে গামবুট বা শক্ত জুতো ব্যবহার করুন এবং শরীরের কোনো স্থানে ক্ষত থাকলে তা ভালোভাবে ঢেকে রাখুন।
৫. বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করুন
বন্যার সময়ে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। তাই সবসময় বোতলজাত কিংবা ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি পান করুন। বন্যার পানির সংস্পর্শে আসা কোনো খাবার খাবেন না। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ফ্রিজে নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। আগে থেকেই শুকনো খাবার, খাবার স্যালাইন (ORS) ও শিশুখাদ্য আলাদা করে রাখুন।
৬. একটি 'জরুরি ব্যাগ' প্রস্তুত রাখুন
হঠাৎ করে বাড়ি ছাড়তে হলে যেন বিপদে পড়তে না হয়, সেজন্য প্রতিটি পরিবারে একটি জরুরি ব্যাগ আগে থেকেই তৈরি রাখা উচিত। এই ব্যাগে যা যা রাখবেন:
- প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ ও ফার্স্ট এইড সামগ্রী
- টর্চলাইট ও অতিরিক্ত ব্যাটারি
- মোবাইল চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক
- শুকনো খাবার এবং বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি
- প্রয়োজনীয় পোশাক ও নগদ টাকা
- গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র
- সহজে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটি বাঁশি বা জরুরি সংকেত দেওয়ার উপকরণ
৭. পানি নেমে গেলেও ঘরে ফিরতে তাড়াহুড়ো করবেন না
পানি কমে গেলেই ঘর বসবাসের উপযোগী হয়ে যায় না। ঘরে ঢোকার আগে ভবনের কাঠামো, দেয়াল, মেঝে, গ্যাসলাইন এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের অবস্থা ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিন। ঘরে ঢুকে দরজা-জানালা খুলে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। জীবাণুনাশক ব্যবহার করে পুরো ঘর ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। ঘরের কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা তার ভিজে থাকলে তা পুরোপুরি শুকানোর আগে কখনোই চালু করবেন না।
বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত ও ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিন। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং পরিবারের সবাইকে দুর্যোগকালীন জরুরি পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকেই জানিয়ে রাখুন।
Comments