মৌলভীবাজার সীমান্তে ১০ জনকে বিএসএফের ‘পুশইন’, রাতেই ফেরত পাঠানোর দাবি বিজিবির
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ি ইউনিয়নের লাঠিটিলা বিওপির অধীনস্থ কচুরগুল সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জন বাংলাভাষীকে বাংলাদেশে পুশইন (জোরপূর্বক পুশ করা) করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে ৫২ বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের দাবি, বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে পুশইন করা ওই ১০ জনকে একই দিন রাতে অন্য একটি নিরাপদ সীমান্ত দিয়ে পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে 'পুশব্যাক' করা হয়েছে।
স্থানীয়দের সীমান্ত আইনি সচেতনতায় এই অনুপ্রবেশের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। কচুরগুল সীমান্তে সন্দেহভাজন ১০ জনকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে লাঠিটিলা বিওপির বিজিবি সদস্যদের খবর দেন। পরে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে একটি স্থানীয় বাড়িতে রাখেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পুশইন হওয়া এই ১০ জনের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, আটকে পড়া নারীরা তীব্র কান্নাকাটি করছেন এবং তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে পুশইন হওয়া ব্যক্তিরা দাবি করেন, তারা ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে জীবিকার সন্ধানে চোরাই পথে ভারতের গুজরাটের বিভিন্ন এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে দিনমজুর হিসেবে কাজ করার পর ভারতীয় আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে এবং কোনো আইনি প্রক্রিয়া (ডিটেনশন বা পুশব্যাকের প্রোটোকল) ছাড়াই গোপনে বাংলাদেশ সীমান্তে এনে পুশইন করে।
রিয়াদুল মোল্লা (৫৫), সাব্বির শেখ (১৯), ফরিদা বেগম (৪০), লাবিবা খাতুন (৮), সুবা (৩২), দিলরুবা (৩৮), রিতা বেগম (৪০), রিয়া বেগম (২৫), লাইলি খাতুন (২৮) ও সালমা খাতুন (২৭)।
এই ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে এবং সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য লাঠিটিলা বিওপিতে যান। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, 'দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ'-এর জুড়ী প্রতিনিধি ও স্থানীয় পরিবেশকর্মী খোর্শেদ আলম তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা তাঁকে তীব্র হেনস্তা করেন। একই সাথে তাঁর ছোট ভাই তাওহিদ আলম এবং তাঁর বন্ধু সাব্বির রহমানকে লাঠিটিলা বিওপির বিজিবি ক্যাম্পে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে শুক্রবার (৩ জুলাই) তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সাংবাদিক খোর্শেদ আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সীমান্তে পুশইনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে বিজিবি ক্যাম্প থেকে আমাদের সহযোগিতা করা তো দূরের কথা, উল্টো আমাকে হেনস্তা করা হয় এবং আমার ভাই ও তার বন্ধুকে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল।"
এই বিষয়ে বিজিবির ৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান বলেন, "স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুশইন হওয়া ১০ জনকে আটক করে বিজিবি। দেশের প্রচলিত আইনি সীমানা রক্ষার্থে পরবর্তীতে তাদের নিয়ে গিয়ে রাতেই অন্য একটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে পুশব্যাক করা হয়েছে।"
সাংবাদিক হেনস্তার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি আরও বলেন, "সীমান্তে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিজিবি পুশইনের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। তবে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, স্থানীয় কিছু মানুষ ও দালাল চক্র অর্থের বিনিময়ে বা অবৈধভাবে এই পুশইনের ক্ষেত্রে বিএসএফকে গোপনে সহযোগিতা করছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা সেইসব দেশবিরোধীদের চিহ্নিত করে খুব দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেব।"
Comments