প্রসঙ্গ দুর্নীতি : ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমল প্রশ্নের মুখে
ধীরে ধীরে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেছেন। বিষয়টি এবার জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে।
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়কালে সংঘটিত সম্ভাব্য দুর্নীতির তদন্তের আহ্বান জানান। তিনি বলেন,এই দেড় বছরে "যমুনার অভ্যন্তরে যেমন দুর্নীতি হয়েছে,তেমনি যমুনার কিনারেও হয়েছে।" তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান,দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) নির্দেশনা দিয়ে ১৮ মাসের প্রতিটি কর্মকাণ্ড তদন্ত করা হোক-কোথায়,কীভাবে এবং কারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল,তা জনগণের সামনে তুলে ধরা হোক।
এর আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও দুর্নীতি বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরেছিলেন। টিআইবির সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী,২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, যে সময়ে সুশাসন ও সংস্কারের সবচেয়ে বেশি কথা বলা হয়েছিল,সেই সময়েই ঘুষ ও দুর্নীতির পরিমাণও বেড়েছে। ইফতেখারুজ্জামান ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেরও সদস্য ছিলেন।
টিআইবি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে,বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। কিন্তু এবার যে বাস্তবতা সামনে এসেছে,তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তথাকথিত সৎ ও সংস্কারমুখী শাসনের সময়েও যদি দুর্নীতি বাড়তে থাকে,তাহলে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তি বা সরকারের নয়;এটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত একটি সংকট।
প্রশ্ন হলো, দুর্নীতি কেন বাড়ে?
প্রথম কারণ,আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমাজের নৈতিক অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। মুখে দুর্নীতির বিরোধিতা করা হলেও বাস্তবে অবৈধ সম্পদের মালিকদের সামাজিক মর্যাদা কমেনি;বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। একসময় সততা ছিল গর্বের বিষয়,আর আজ অনেক ক্ষেত্রে অসৎ উপায়ে সম্পদ অর্জনই সফলতার মানদণ্ড হয়ে উঠছে। এমনকি পরিবার ও সমাজের চাপও অনেককে বৈধ-অবৈধ উপায়ে বেশি অর্থ উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে,অস্বাভাবিক সম্পদ ও বিলাসিতার প্রকাশ্য প্রদর্শনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কার্যকর অবস্থানও খুব একটা দেখা যায় না। ফলে সমাজে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে,সম্পদের উৎস নয়,সম্পদের পরিমাণই মুখ্য।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বৈষম্য। আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে মানুষ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চায়। যখন বৈষম্য বাড়ে,তখন অনেকের কাছেই দুর্নীতি দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার একটি সহজ পথ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। অথচ বৈষম্য ও দুর্নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সমাজে খুব কমই আলোচনা হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে বলা হতো,উন্নয়নের সঙ্গে কিছুটা বৈষম্য ও দুর্নীতি নাকি অবশ্যম্ভাবী। সেই যুক্তি আজ আর তেমন উচ্চারিত না হলেও বাস্তবতা হলো-উন্নয়ন কখনোই দুর্নীতির সমার্থক হতে পারে না। উন্নয়ন ও দুর্নীতি পাশাপাশি চলতে পারে,আবার এমনও হতে পারে যে উন্নয়নের নামে কেবল দুর্নীতিই হয়। এই দুই বাস্তবতা এক নয়।
দুর্নীতি মূলত উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়গুলোর একটি। এটি রাষ্ট্রের সম্পদ অপচয় করে,জনসেবার মান কমিয়ে দেয় এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে। স্বাস্থ্য,শিক্ষা, বিচার কিংবা অন্যান্য মৌলিক সেবায় দুর্নীতির প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনমানকে নিচের দিকে ঠেলে দেয়।
দুর্নীতি যখন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে,তখন তা শুধু অপরাধ হিসেবে থাকে না;ধীরে ধীরে সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়। তখন দুর্নীতিবাজরা ধরে নেয়,শাস্তির ঝুঁকি কম এবং লাভ অনেক বেশি। আর যদি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকেই রাজনৈতিক প্রশ্রয় মেলে,তাহলে দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ সত্য কি না,তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হওয়া উচিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক,দুর্নীতির দায় থেকে তার অব্যাহতি নেই। একই সঙ্গে সমাজকেও এমন একটি নৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে হবে,যেখানে দুর্নীতিকে কোনোভাবেই সাফল্যের প্রতীক নয়,বরং লজ্জা ও ঘৃণার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সেই সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে দুর্নীতির এই দুষ্টচক্র ভাঙা কঠিনই থেকে যাবে।
Comments