রাষ্ট্রের টাকায় চিকিৎসা: বৈধতার আড়ালে নৈতিকতার প্রশ্ন
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় শক্তি ছিল তাদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকারে যুক্ত হয়েছিলেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার পরিচিত ব্যক্তিত্ব,যাদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল-তারা ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে,সৎ,মিতব্যয়ী এবং জনস্বার্থে নিবেদিত। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে ক্লান্ত মানুষের কাছে এই সরকার ছিল একটি নৈতিক বিকল্পের প্রতীক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দুর্নীতির ধারণা সূচকে অবনতির খবর যেমন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে,তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিদেশে চিকিৎসা বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ গ্রহণের তথ্যও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। আইনগতভাবে এসব ব্যয় অনুমোদিত হতে পারে,কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতার প্রশ্ন কখনোই কেবল আইনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
দৈনিক আগামীর সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী,ধর্মবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন প্রায় ৮২ লাখ টাকা এবং অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রায় ৭৯ লাখ টাকা বিদেশে চিকিৎসা বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে গ্রহণ করেছেন। অন্য কয়েকজন উপদেষ্টাও বিভিন্ন অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় নিয়েছেন। সরকারের বিধিমালা অনুযায়ী,প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র,বিল ও ভাউচার দাখিলের মাধ্যমে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্র বহন করতে পারে। ফলে কেবল অর্থ গ্রহণের ঘটনাকে বেআইনি বলা যাবে না। তবে যদি কোনো ক্ষেত্রে যথাযথ নথিপত্র ছাড়া অর্থ ছাড় হয়ে থাকে,তাহলে তা অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ বিষয় এবং দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কিন্তু আইনের বাইরে আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে-নৈতিকতার প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন না;তারা ছিলেন একটি নৈতিক প্রত্যাশার বাহক। জনগণ তাদের কাছ থেকে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিল,যেখানে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয় থাকবে।
এখানেই মূল বিতর্কের জন্ম। যারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অপচয়,বিশেষ সুবিধাভোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সমালোচনা করেছেন,তাদের আচরণ কি সেই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল? বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিগতভাবে কারও অধিকার হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থে উচ্চ ব্যয়ের চিকিৎসা গ্রহণের আগে অন্তত এই প্রশ্নটি বিবেচনায় আসা উচিত ছিল-এই সিদ্ধান্ত জনমনে কী বার্তা দেবে?
আরও একটি বাস্তব প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি এই ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের দায়িত্বে না থাকতেন, তাহলে কি তারা একই ব্যয়ে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারতেন? হয়তো কেউ পারতেন, কেউ পারতেন না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণের অর্থ ব্যবহারে সংযম প্রদর্শনই তো ছিল তাদের নৈতিক দায়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কারও অসুস্থতাকে ছোট করে দেখা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা উদ্দেশ্য নয়। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতা। যদি বিদেশে চিকিৎসাই একমাত্র কার্যকর বিকল্প হয়ে থাকে এবং সব প্রক্রিয়া বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়ে থাকে,তাহলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচিত ছিল বিষয়টি শুরু থেকেই স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা। তথ্য গোপন রেখে পরে বিতর্কের জন্ম দেওয়ার পরিবর্তে আগেই ব্যাখ্যা দেওয়া জনআস্থা রক্ষায় সহায়ক হতো।
এ ঘটনায় আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে-বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি নীতিনির্ধারকদের আস্থার প্রশ্ন। যদি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরাই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হন, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করবে যে দেশের স্বাস্থ্যখাত উন্নতির পথে রয়েছে? রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের আচরণ অনেক সময় নীতিগত বার্তা বহন করে। ফলে তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও জনপরিসরে রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করে।
এ কারণেই প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা। চিকিৎসা ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না,প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে দাখিল করা হয়েছে কি না এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না-এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া উচিত। তদন্তের ফল যাই হোক,তা জনসমক্ষে প্রকাশ করাও জরুরি। স্বচ্ছতা ছাড়া আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে আইনের পাশাপাশি নৈতিক মানদণ্ডও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে "বৈধ" হওয়াই যথেষ্ট নয়; সেটি জনগণের কাছে "ন্যায্য" বলেও প্রতীয়মান হতে হবে। কারণ গণতন্ত্রে আস্থার সংকট তৈরি হয় শুধু দুর্নীতির কারণে নয়, নৈতিক প্রত্যাশা ও বাস্তব আচরণের ব্যবধান থেকেও।
জনগণ এমন নেতৃত্বই চায়,যারা কেবল দুর্নীতিমুক্ত নয়,বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে আত্মসংযমেরও উদাহরণ স্থাপন করবে। নৈতিকতার দাবি যত বড় হবে, সেই মানদণ্ডে জবাবদিহির দায়িত্বও তত বেশি হবে। আর সেই জবাবদিহিই একটি গণতান্ত্রিক ও বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি।
Comments