মাছির অত্যাচারে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী, আদালতের যাওয়ার হুঁশিয়ারি!
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় একটি বাণিজ্যিক মুরগির খামারের বর্জ্য ও তীব্র দুর্গন্ধের কারণে একটি পুরো গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা বিষাদময় হয়ে উঠেছে। উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে লেয়ার মুরগির ওই খামারের জমাটবদ্ধ বিষ্ঠা থেকে ছড়ানো মাছি ও উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ বাসিন্দারা এবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রশাসনের তদন্তে গ্রামবাসীর অভিযোগের শতভাগ সত্যতা মিললেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে ঈশ্বরীপুর গ্রামের ওই পোল্ট্রি খামারে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরের মেঝেতে কয়েক সপ্তাহের মুরগির বিষ্ঠা জমা করে বিশাল স্তূপ তৈরি করা হয়েছে। কোনো ধরনের জীবাণুনাশক বা দুর্গন্ধনাশক রাসায়নিক ব্যবহার না করায় পুরো এলাকায় এক অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। লাখ লাখ মাছি পুরো গ্রামে ভনভন করছে।
গ্রামবাসীর তথ্যমতে, এই ঈশ্বরীপুর এলাকায় প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন। 'স্বপন' নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এই খামারের কারণে গত তিন মাস ধরে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
মাছির এই পৈশাচিক উপদ্রবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও সদ্য মায়েরা। স্থানীয়দের ঘরোয়া জীবনের কয়েকটি অবর্ণনীয় চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
গ্রামের গৃহিণী রোহেনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "তরকারি রান্না করে ঘরে রাখার জো নেই। ভাতের থালা দেওয়ামাত্রই মাছি এসে পড়ে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে টিকে থাকাই দায়। প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে আমরা শেষ ভরসা হিসেবে আদালতে যাব।"
সদ্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মা হওয়া লিপি খাতুন জানান, চব্বিশ ঘণ্টা মশারি টাঙিয়ে নবজাতককে রাখতে হচ্ছে। মাছি সব সময় শিশুর মুখে-চোখে বসার চেষ্টা করে।
গ্রামের সিরাজুল ইসলাম জানান, এই মাছির ঘেন্নায় ও দুর্গন্ধে গত ছয় মাস ধরে কোনো আত্মীয়স্বজন ও জামাই তাঁদের বাড়িতে বেড়াতে আসতে চান না। এমনকি খাবারের সাথে অসাবধানতাবশত মাছি পেটে চলে যাওয়ার মতো বিব্রতকর ঘটনাও ঘটছে।
ভুক্তভোগীরা জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানানোর পর গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসন একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, খামারের বর্জ্যের কারণে পুরো এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি গবাদিপশুর স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়ায় বিঘ্ন ঘটছে। খামারে পরিবেশ আইন মেনে বর্জ্য নিষ্কাশন করা হচ্ছে না।
তদন্ত প্রতিবেদনটি পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন বলেন, 'আমরা গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনটি হাতে পেয়েছি। খামারটিতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামার মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
তবে এ বিষয়ে খামার মালিক স্বপনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অবিলম্বে এই বর্জ্যের স্তূপ অপসারণ করে স্থায়ী সমাধান না করা হলে পুরো গ্রামে বড় ধরনের মহামারি ও জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
Comments