সিডিএর গৌরব ফেরানোর তাগিদ এমপিদের, প্ল্যান পাসে হয়রানি করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি চেয়ারম্যানের
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে অতীত গৌরবে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যরা। তারা বলেছেন, সিডিএ কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করলে কখনও অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পরিবেশ ধ্বংস, অবৈধ দখল হবে না। সংস্থাটিকেই তাদের পথনকশা ঠিক করতে হবে। আমরা প্রয়োজনে পরিকল্পিত শহর, শতভাগ বাণিজ্যিক রাজধানী, সবুজ, টেকসই, দূর্যোগ সহনশীল, নান্দনিক শহর গড়ে তুলতে জাতীয় সংসদেও কথা বলব।
শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবনের সম্মেলন কক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভায় চট্টগ্রামের সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা একথা বলেন। সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে বিজয়ী সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শাকিলা ফারজানা।
সংসদ সদ্যসরা বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) সত্যিকারে জনবান্ধব সংস্থায় রূপ দিতে সংসদে তারা নিয়মিত সোচ্চার থাকবেন। চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করে মাস্টারপ্ল্যানের পরিপ্রেক্ষিতে শহরের উপর চাপ কমিয়ে উপশহর গড়ে তুলতে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। তবে সিডিএ নিজেদের কাজের গতি ও স্বচ্ছতা না বাড়ালে তা কখনও সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন এমপিরা।
সমন্বয় সভায় সিডিএ'-র অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, "জমির দাম তিনগুণ দিয়ে সিডিএ'র পক্ষে কখনও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এটি আইন করে পরিবর্তন করা জরুরি। রাজউক, ভূমি মন্ত্রণালয় এটি প্রস্তাব দিতে হবে। তাছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঠেকাতে সকল সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয় করতে হবে।" তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সিডিএ'র অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। এই সংস্থার অনেক বদনাম রয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলে অনেক দুর্নীতি ঘিরে ফেলেছিল অফিসটাকে। আমরা চাই না সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটুক।" ভবনের প্ল্যান অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বিদ্যুৎ ও পানিসহ সব সংস্থার সংযোগ নিশ্চিত করার পর সিডিএ-কে অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং নতুন আইন নিয়ে সংসদে কথা বলার আশ্বাস দেন। এ সময় তিনি বলেন, আমরা জনগণের সরকার, জনগণের জন্যই কাজ করি। তারা চান না, এমন কিছু আমরা করব না।
সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম সিডিএ-র আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানিয়ে বলেন, সিডিএ তাদের আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে কেউ শহরে ৬ তলার অনুমোদন নিয়ে ১২ তলা ভবন করতে পারবে না। মানুষকে সিডিএ'র আইন সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি নিয়মের বাইরে গেলে ভবন ভেঙে ফেলা হবে এই বার্তা দেওয়া জরুরি।
নগরের স্বার্থে সব এমপি প্রয়োজনে যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবেন বলে জানান সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, 'প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ পেতে এবং আইন সংস্কার করতে আমরা সংসদে ভূমিকা রাখব। তবে চট্টগ্রামে কোথায় কী ধরনের ভবন গড়ে উঠছে, তা ঠেকানোর দায়িত্ব সিডিএ-র। খাল-নালা দখলের কারণে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা হচ্ছে এবং নগরবাসী মাঝেমাঝে কষ্ট পাচ্ছে। এই বিষয়ে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে'।
সমন্বয়হীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, "সবচেয়ে জরুরি হলো সমন্বয়, যা যুগ যুগ ধরে হচ্ছে না। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হলেও সমন্বয়ের অভাবে সেটি মানা হয় না।" সিডিএ চেয়ারম্যানকে নিজের ক্ষমতা পুরোপুরি প্রয়োগ করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, "ক্ষমতাবান ব্যক্তির অবৈধ অনুরোধে বারবার 'না' বলতে পারলেই কাজ হবে। সবার মন রক্ষা করে কখনও কাজ হয় না। আইন প্রয়োগ সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।" তিনি আসন ভিত্তিক সমস্যাগুলো নির্দিষ্ট করে এমপিদের সাথে সমন্বয় করে সিডিএ-র একটি সুনির্দিষ্ট পথনকশা তৈরির প্রস্তাব দেন।
সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, চট্টগ্রামের অনেক আবাসিক এলাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠলেও অতীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে কল্পলোক আবাসিকে ব্যাপক অপরিকল্পিত ভবন গড়ে ওঠেছে। যার ফলে ভবন মালিকরা আইনের তোয়াক্কা করেনি এবং এখানে দুর্নীতি হয়ে থাকতে পারে। আইন প্রয়োগে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, অর্থমন্ত্রী আমাকে বলেছেন তার যদি কোন ভবন নিয়ম বর্হিভূতভাবে গড়ে ওঠে সেটিও ভেঙে ফেলা হোক। কাউকে কোন ছাড় নয়৷ চট্টগ্রামকে নান্দনিক করতে তিনি সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন বলে তাকে আশ্বাস দিয়েছেন।
জনভোগান্তির কথা উল্লেখ করে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, "সিডিএ সম্পর্কে মানুষের মনে অনেক খারাপ ধারণা রয়েছে। একটা ভবনের প্ল্যান নিতে নাকি মানুষকে দুই বছর ঘুরতে হয়। কেন এমন হয়রানি হতে হবে?" তিনি সাফ জানিয়ে দেন, "জনবান্ধব সিডিএ গড়ে তুলতে কেউ যদি অসহযোগিতা করে বা দুর্নীতির আশ্রয় নেয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
সভাপতির বক্তব্যে সিডিএ চেয়ারম্যান আরও জানান, আজকের এই সমন্বয় সভার আলোচনার আলোকে এবং সংসদ সদস্যদের দেওয়া পরামর্শের ভিত্তিতে দ্রুত একটি কার্যকর পথনকশা তৈরি করা হবে। শহরকে নান্দনিক, সবুজ, পরিকল্পিত ও টেকসই রূপ দিতে তিনি কাজ করে যাবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সভায় সিডিএ'র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Comments