লালমনিরহাটে শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার: বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় আহত ১০
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে নিখোঁজ এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এলাকা। পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলে অভিযুক্তের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) গাড়িবহরে হামলা এবং ভাঙচুর চালিয়েছে উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। এ সময় পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন, ২০২৬) সকালে উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত নন্দিনী রানী (৭) ওই গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। এই ঘটনায় অবহেলার দায়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর থেকে শিশু নন্দিনী নিখোঁজ ছিল। পরিবারের সদস্যরা দিনভর খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো সন্ধান পাননি। অভিযোগ রয়েছে, রাতে আদিতমারী থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি, উল্টো পরিবারকে আরও খোঁজাখুঁজি করার পরামর্শ দিয়ে ফিরিয়ে দেয়।
পরদিন মঙ্গলবার সকালে নিহতের বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করতেই প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় নন্দিনীর মরদেহ বেরিয়ে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ফলিমারী গ্রামে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। ক্ষুব্ধ জনতা ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে প্রতিবেশী রঞ্জিত চন্দ্রের ছেলে বিধান চন্দ্রের (২৩) বাড়িতে হামলা চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। আগুনে কয়েকটি বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং ভেতরের লোকজনে আটকা পড়েন।
খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তের বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে আসা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়িবহরে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণেও বাধা দেয় বিক্ষোভকারীরা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় পুলিশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। এরপর আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটি থেকে অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে মূল অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে (২৩) ইতোমধ্যে আটক করেছে পুলিশ।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয়েছে এবং অবরুদ্ধদের উদ্ধার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন বিধান চন্দ্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং পুলিশের কাজে বাধা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বর্তমানে ফলিমারী গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওসির প্রত্যাহারের পর স্থানীয়দের ক্ষোভ কিছুটা কমলেও এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
Comments