শুক্রবারেই জেনেভায় সই: তার আগেই প্রকাশ পেতে পারে ইরান-মার্কিন চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক চুক্তিটি (সমঝোতা স্মারক) আগামী শুক্রবারের আগেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হতে পারে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি ইতিমধ্যে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে চুক্তিটি সই হয়েছে। প্রাথমিক চুক্তির সব কিছুতেই স্বাক্ষর করা হয়েছে।"
চুক্তিটি প্রকাশের বিষয়ে ফক্স নিউজ ও সিএনএন-কে জেডি ভ্যান্স বলেন, এই সমঝোতা স্মারকটি মাত্র দেড় পৃষ্ঠার একটি অত্যন্ত সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত নথি। বেশ কিছু জটিল ও কারিগরি বিষয় ভবিষ্যতের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। তবে এই কাঠামোটির অধীনে ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে চুক্তির যাবতীয় সুবিধা ও অর্থনৈতিক ছাড় পাবে।
দলিলের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইরান আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে, যার মধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করাও অন্তর্ভুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের একটি যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি থাকবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিদর্শকেরা ইরানে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পাবেন এবং তারা ইরানকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে সহায়তা করবে।
পশ্চিমা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন, ২০২৬) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিনই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি' আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। একই দিন সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নতুন দফার কারিগরি আলোচনা শুরু হবে বলে নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তিটিতে ইতোমধ্যে ট্রাম্প, ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লমেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষর করেছেন। এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বৃদ্ধি পাবে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌযান রক্ষায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক জোট গঠনের বিষয়ে ট্রাম্প অবশ্য কিছুটা ভিন্ন সুর শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, "মুক্ত জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে আমাদের খুব একটা বহিরাগত সাহায্যের প্রয়োজন হবে বলে আমি মনে করি না। তবে এই কৌশলগত জলপথে অন্য দেশের একটি বা দুটি যুদ্ধজাহাজ থাকা খারাপ ধারণা নয়।"
এদিকে চুক্তিটি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "চুক্তি হোক বা না হোক, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।"
পাল্টা জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেন, "এখন থেকে লেবাননে যেকোনো ইসরায়েলি আক্রমণ বা তাদের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এই অন্তর্বর্তী চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করবে ইরান। আমাদের দৃষ্টিতে, এই সমঝোতা স্মারকের দুই পক্ষ হলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরান ও হিজবুল্লাহ।"
মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য স্পষ্ট করেছেন যে, এই যুদ্ধবিরতির কাঠামোর মধ্যে লেবানন অন্তর্ভুক্ত থাকলেও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এই চুক্তির শর্ত নয় এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার বজায় থাকবে। এছাড়া যেকোনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত পূরণে ইরানের সফলতার ওপর।
সোমবার সন্ধ্যায় নেতানিয়াহু জানান, ইসরায়েলি বাহিনী যতদিন প্রয়োজন লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় অবস্থান করবে। এই বক্তব্যের পরপরই লেবাননের গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ লেবাননে একটি গাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় চার জন নিহত হয়েছেন, যা শান্তিচুক্তি ঘোষণার পর প্রথম বড় হামলা। এর জবাবে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি বাহিনীকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে, যা এই ভঙ্গুর চুক্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।
Comments