মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি আসলে প্রশাসনের ‘হুকুমনামা’: আনু মুহাম্মদ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি একে কোনো সাধারণ চুক্তি নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের একতরফা 'হুকুমনামা' বলে অভিহিত করেছেন।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। 'সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট' (১৩টি বাম ও প্রগতিশীল দলের প্ল্যাটফর্ম) এই বৈঠকের আয়োজন করে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন,'বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি হওয়া স্বাভাবিক হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিটি মূলত একতরফা। এতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বীকৃত নীতিমালার কোনো প্রতিফলন নেই। ঘাটতি বাণিজ্যের অজুহাতে বাংলাদেশকে বেশি দামে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।"
তিনি চুক্তির টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি সই করে, যা নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করা যেত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ভারতের মতো দেশগুলো যেখানে এই চুক্তি এড়িয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশ কেন নিজে থেকে আগ্রহ দেখাল, তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, যারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে তারা মূলত মার্কিন পক্ষেরই লোক।
আলোচকরা সতর্ক করেন যে, এই চুক্তির ফলে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
- রাজস্ব ক্ষতি ও ভর্তুকির বোঝা: যুক্তরাষ্ট্র থেকে চড়া দামে গম, তুলা, মাছ বা মাংস আমদানি করতে হলে একদিকে সরকারের রাজস্ব কমবে, অন্যদিকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। যার চূড়ান্ত বোঝা বইতে হবে সাধারণ জনগণকে।
- ঝুঁকিতে দেশীয় খাত: ওষুধ, ডেইরি, আইটি, ই-কমার্স এবং দেশীয় গ্যাস সম্পদ এই চুক্তির কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
সিপিডি-র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান চুক্তিটিকে 'একপক্ষীয় ও অসম' আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানান। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করে বলেন: ৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তিন দিন আগে বাংলাদেশ এই চুক্তি সই করে। ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আদালত সেই অতিরিক্ত শুল্ক বাতিল করে দেয়, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ চুক্তিটি করেছিল।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "আর মাত্র কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলে এই চুক্তির কোনো প্রয়োজনই হতো না। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির স্বাধীনতা খর্ব হবে। এখন চীনসহ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।"
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারাও এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন।জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের ওপর শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত অসম শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত অবিলম্বে এটি বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া। ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা মন্তব্য করেন, দেশ যেন মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দরকার।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ সভাপতির বক্তব্যে জানান, তথাকথিত 'গোপনীয়তার নীতি' মেনে বাংলাদেশ সরকার চুক্তিটি প্রকাশ না করলেও, মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের ওয়েবসাইটে ২৮ পৃষ্ঠার এই নথিটি প্রকাশ পেয়েছে। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এটি বাতিল করা আবশ্যক।
বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান এবং বিজিএমইএ'র সহসভাপতি ইনামুল হক খানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
Comments