দাদির কবরের ফুলগাছ চুরির জবাবে পুরো গ্রাম সাজালেন যুবক
দাদির কবরের পাশে পরম যত্নে রোপণ করা তিনটি ফুলগাছ চুরি হয়ে গিয়েছিল। এমন ঘটনায় সাধারণত মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন বা চোরকে খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার এক যুবক বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক পথ। প্রতিশোধ বা ক্ষোভের বদলে তিনি চোরকে দিলেন এক অভিনব ও ভালোবাসার জবাব। পুরো এলাকায় ফুলগাছ চুরি বন্ধ করতে এবং চোরের মনে অনুশোচনা জাগাতে নিজের খরচে পুরো গ্রামের ৫০০টি বাড়ির সামনে ১ হাজার ৫০০টি ফুলগাছ রোপণ করেছেন তিনি। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের যুবক হাওলাদার শামীম আহমেদ।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে নিজের দাদির কবরের পাশে শখ করে হাসনাহেনা, কামিনী ও শিউলী-এই তিন প্রজাতির তিনটি ফুলগাছ রোপণ করেছিলেন শামীম। নিয়মিত পরিচর্যা ও যত্নে গাছগুলো বড় হয়ে উঠছিল এবং সম্প্রতি একটি গাছে ফুলও ফোটে। কিন্তু ফুল ফোটার পরদিন সকালে কবরস্থানে গিয়ে শামীম দেখেন, ফুটন্ত গাছসহ তিনটি গাছই কে বা কারা উপড়ে চুরি করে নিয়ে গেছে।
দাদির কবরের স্মৃতি জড়ানো গাছ হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মনে কষ্ট পান শামীম। তবে চোরের প্রতি ক্ষুব্ধ না হয়ে বিষয়টি তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন। শামীমের ভাষায়, যে ব্যক্তি গাছগুলো চুরি করেছে, সে নিশ্চয়ই ফুল ভালোবাসে। আর এই ভাবনা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন শুধু নিজের বাড়ির আঙিনায় নয়, পুরো গ্রাম জুড়েই ফুলের সুবাস ছড়িয়ে দেবেন।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। নিজস্ব অর্থায়নে শ্রমিক নিয়োগ করে পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের ৫০০টি বাড়ির সামনে তিনটি করে মোট ১ হাজার ৫০০টি ফুলগাছ রোপণের কাজ শুরু করেন তিনি। প্রতিটি বাড়ির সামনেই রোপণ করা হয় কবরস্থান থেকে চুরি হয়ে যাওয়া সেই তিন প্রজাতির গাছ-হাসনাহেনা, কামিনী ও শিউলী।
সরেজমিনে দিনব্যাপী শামীমকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাছ রোপণ করতে দেখা গেছে। কেবল গাছ লাগিয়েই তিনি ক্ষান্ত হচ্ছেন না, প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দাদের গাছগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করার জন্যও অনুরোধ জানাচ্ছেন।
শামীমের এই অভিনব উদ্যোগে দারুণ খুশি এলাকাবাসী। স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর তুহিনসহ কয়েকজন জানান, ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে পুরো গ্রামের জন্য এমন সুন্দর একটি উদ্যোগ তৈরি হওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। নেতিবাচক ঘটনার এমন ইতিবাচক সমাধান সমাজে খুব কমই দেখা যায়। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। গ্রামবাসীদের আশা, আর কয়েক মাস পরেই যখন গাছগুলোতে ফুল ফুটবে, তখন পুরো গ্রাম সুগন্ধে ও সৌন্দর্যে ভরে উঠবে।
উদ্যোগী যুবক হাওলাদার শামীম আহমেদ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, আমি চোরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করিনি। বরং এমন ব্যবস্থা করেছি যাতে পুরো গ্রামেই ফুলগাছ থাকে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে হয়তো চোরের বাড়িতেও আমার রোপণ করা গাছ পৌঁছে গেছে। সে যখন দেখবে যে গাছের জন্য সে চুরি করেছিল, তা এখন তার নিজের দুয়ারেই হাজির, তখন সে যদি অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে আর এমন কাজ না করে, তবেই আমার এই কষ্ট সার্থক হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আরও জানান, তার লক্ষ্য শুধু চোরকে শিক্ষা দেওয়া নয়, বরং পুরো এলাকাকে ফুলে-ফলে ভরিয়ে তোলা। আগামীতে সদরপুর উপজেলার প্রতিটি গ্রামে ফুল ও ঔষধি গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে তার, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে এবং মানুষের মধ্যে সবুজায়নের আগ্রহ বাড়াবে।
Comments