স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ছে: সত্যিই কি বদলাবে সাধারণ মানুষের ভাগ্য?
দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা দীর্ঘদিনের এক বাস্তব চিত্র। সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও সেখানে অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার শেষ নেই। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালের আকাশচুম্বী খরচ মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ২০২২ সালেই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশের ৬১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এমন এক চরম সংকটের মুখে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সুসংবাদ নিয়ে আসছে নতুন বাজেট।
নতুন এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা মোট বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে?
কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যসেবার নানা উন্নতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো অন্ধকার। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ক্যানসার আক্রান্ত শহীদ আলীর মতো শত শত রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না মেঝেতেও। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ঘুরেও মিলছে না সেবা। উল্টো দালাল ও নিরাপত্তাকর্মীদের দুর্ব্যবহার এবং সরকারি টেস্ট বাদ দিয়ে চিকিৎসকদের নিজস্ব চেম্বারে পাঠানোর সিন্ডিকেট তো রয়েছেই।
ঢাকার বাইরের চিত্র আরও করুণ। গ্রামীণ অঞ্চলের কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরাই নিজেদের সন্তানদের জন্য প্রাথমিক ওষুধ পাচ্ছেন না। ওষুধ বা চিকিৎসার জন্য তাদের ছুটতে হচ্ছে দূর-দূরান্তের জেলা শহরে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করতে পারে। অন্যদিকে, বিআইডিএসের তথ্যমতে—অর্থের অভাব, লোকলজ্জা বা সচেতনতার অভাবে দেশের ৬৫.১৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যার বড় শিকার উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের সমাধান শুধু টাকার অঙ্ক বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঠিক বাস্তবায়ন ও বণ্টনের ওপর নির্ভর করছে।
বাজেটকে প্রকৃত অর্থেই 'জনবান্ধব' করতে হলে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। বরাদ্দকৃত অর্থ যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থেকে সঠিক সময়ে মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের টেস্ট ও ওষুধ নিয়ে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডাক্তার, কর্মী ও ওষুধের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এই বিপুল অর্থের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের হাসপাতালের সিঁড়িতে রাত কাটানোর কিংবা চিকিৎসার খরচে দরিদ্র হওয়ার চিরচেনা চিত্রটি হয়তো বদলাবে না।
Comments