আসছে রেকর্ড বাজেট, অর্থের জোগানই বড়ো চ্যালেঞ্জ
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সরকার বলছে, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে নতুন বাজেট তৈরি করা হয়েছে। আকারের দিক থেকে এটি হবে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বাজেট বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
১৯ বছর পর এই বাজেট দিচ্ছে বিএনপি সরকার। সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষে যে ভঙ্গুর অর্থনীতি নতুন সরকার পেয়েছে, তা পুনর্গঠনের প্রতিফলন থাকবে আগামী বাজেটে। তবে বড়ো বাজেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন অর্থের জোগান।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সরকারের মোট আয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপও মোকাবিলা করতে হবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। ডলারের উচ্চমূল্য ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
রাজস্ব বাড়াতে সরকার কর ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানোর চিন্তা থাকলেও মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট অব্যাহতির সুযোগও কমানো হতে পারে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, করের আওতা সম্প্রসারণ ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প কম। তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়।
আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকারের মতে, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় বাজেট ও বড় প্রকল্প ঘোষণা হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়ে গেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ করা হতে পারে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া শুধু ভাতা বাড়িয়ে দারিদ্র্য হ্রাস করা কঠিন।
এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের বেশি। আগামী বাজেটে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। একই সময়ে বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্প ও বিনিয়োগে গতি ফেরাতে কিছু খাতে কর ছাড়, শুল্ক সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির ঘোষণা আসতে পারে। তবে ব্যবসায়ীরা ডলার সংকট, উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান চান।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সংস্কার কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিককরণ, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের চাপও রয়েছে সরকারের ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ধীরে ধীরে সংস্কারের পথেই এগোবে।
বাজেট বড় হলেও প্রবল অর্থের সংকট রয়েছে। সব পক্ষকে স্বস্তি দিয়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Comments