বাজেট ঘিরে পুঁজিবাজারে প্রত্যাশা বনাম নির্মম বাস্তবতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ব্যাংক খাতের চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দেশের পুঁজিবাজারও এর বাইরে নয়। দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট, তারল্য সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তায় ধুঁকছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। টানা দরপতনে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী দিশেহারা।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং বাজারকে গতিশীল করতে প্রতি বছরই জাতীয় বাজেটের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু বছর শেষে দেখা যায়, প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে বড় একটি ফারাক থেকেই যায়। বাজার যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়ে যায়।
তবে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, আসন্ন জাতীয় বাজেট যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে একটি বাস্তবমুখী রোডম্যাপ হয়ে ওঠে।
চলতি সপ্তাহে টানা তিনদিন পুঁজিবাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সব সূচকের উত্থানের পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণও। একই সঙ্গে লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে। আসন্ন বাজেট ও ঈদুল আজহার আগে বাজারের এই ধারাবাহিক উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে।
আসন্ন বাজেট ঘোষনার আগে বিনিয়োগকারীদের দাবি ও প্রত্যাশাগুলোও নিম্নরূপ:
কর ছাড় ও কর কাঠামোর সংস্কার: পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কর কাঠামো সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) ইতোমধ্যে বাজেটে পুঁজিবাজারবান্ধব করনীতির প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কর সুবিধা দেওয়া, ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর কর রেয়াত এবং মূলধনী মুনাফার কর সহজীকরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকে উচ্চ সুদহার থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে ঝুঁকতে আগ্রহী নন। তারা তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ ব্যাংকেই রাখছেন। তাই বাজেটে এমন কিছু নীতিগত সুবিধা দেয়া দরকার যা মানুষকে পুঁজিবাজারমুখী বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ: প্রায় প্রতি বছরই বাজেটে কোনো না কোনোভাবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। বাজারের বর্তমান তারল্য সংকট কাটাতে অনেক বিনিয়োগকারী চান, নির্দিষ্ট শর্তে শেয়ারবাজারে এই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হোক। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে এবং লেনদেনে গতি ফিরবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ এ ধরনের সুযোগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, ঢালাওভাবে এই সুবিধা দেওয়া হলে তা এক ধরনের নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে এবং নিয়মিত করদাতাদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে।
কারসাজি নিয়ন্ত্রণে আইনের কঠোর প্রয়োগ: ইনসাইডার ট্রেডিং, কারসাজি এবং কৃত্রিমভাবে শেয়ারদর বাড়ানোর অভিযোগ বহুদিনের। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও ডিএসইর কাছ থেকে আরও কার্যকর নজরদারি, দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং দৃশ্যমান সুশাসন প্রত্যাশা করেন। কারণ সুশাসন ও জবাবদিহিতা ছাড়া বাজারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি: অনেক বিনিয়োগকারী মনে করেন, বাংলাদেশের বড় ও লাভজনক অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনও পুঁজিবাজারে আসেনি। ফলে বাজারে মানসম্পন্ন শেয়ারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে ভালো ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আইপিওতে আনার দাবি দিনদিন জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, টেলিকম ও রপ্তানিমুখী খাতের বড় কোম্পানিগুলো বাজারে এলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি বাজারকে গুজব ও অস্থিরতা থেকে রক্ষা করতে মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা ও পেনশন ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতের বাজেটগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের বাস্তবায়নের বড় একটি ফারাক রয়ে গেছে। সরকার রাজস্ব আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পুঁজিবাজারের জন্য কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রণোদনা দিতে পারেনি। ফলে বাজেট ঘোষণার পর অনেক সময় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার বদলে উল্টো হতাশা তৈরি হয়েছে।
শুধু সাময়িক কর ছাড় বা কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়িয়ে বাজার চাঙ্গা করা সম্ভব নয়—এই বাস্তবতা এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও বুঝতে শিখেছেন। এখন তারা সূচকের সাময়িক উত্থান নয়, বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং তাদের কষ্টার্জিত পুঁজির নিরাপত্তা চান।
১৮ কোটি মানুষের দেশে সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কয়েক লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় খুবই কম। সরকার যদি শুধু আশ্বাসের বাণী না শুনিয়ে এবারের বাজেটে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং বাস্তবমুখী করনীতি নিশ্চিত করতে পারে, তবেই দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
Comments