পুরোনো মালিকদের ব্যাংক জগতে চান না এখনকার মালিকরা
সংকটে থাকা শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন না সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক মালিকরা। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগতভাবে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা আগের মতোই এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক মালিকপক্ষ যে আবেদন জমা দিয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। এছাড়া তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে ১০ বছর সময় চেয়েছেন, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ আবেদনটি নাকচ করার পক্ষে মত দিয়েছে। একই সঙ্গে 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬' অনুযায়ী একীভূতকরণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে – সরকার পাঁচ শরিয়া ব্যাংক বিলুপ্ত করে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকই করবেই। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের কাজও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যাংকারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে ডাকা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো – গ্রাহকরা কি টাকা ফেরত পাবেন? হেয়ার কাটের নামে গ্রাহকদের মুনাফা চলবেই? পুঁজি বাজারে যারা এই পাঁচ ব্যাংকে বিনিয়োগ করে সব হারালেন তারা কী পাবেন?
এদিকে,ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বা বিএবি-বলছে পুরোনো কোন মালিকই যেন আর ফিরতে না পারে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আইনের উদ্দেশ্য হলো-সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে দ্রুত পুনর্গঠন করা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং পুরো ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু এই আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএবি।
তাদের প্রধান আপত্তি কোথায়? আইনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যাংক মার্জার বা একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে, সেই ব্যাংকের সাবেক মালিক বা পরিচালকরা চাইলে খুব সীমিত শর্তে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারবেন। শর্তটি হলো-সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করলেই মালিকানা ফিরে পাওয়া যাবে। আর বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করতে হবে।
একটি নৈতিক প্রশ্ন তলেছে বিএবি। যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনার কারণে একটি ব্যাংক সংকটে পড়েছে, তাদের আবার একই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক? এছাড়া তারা বলছে, এতে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে কীভাবে দেখবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে "ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫" জারি করেছিল। এর আওতায় পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।ৱ এই ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এবং এক্সিম ব্যাংক। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক "সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি" নামে নতুন একটি রাষ্ট্রীয় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ইসলামী ব্যাংক।
এরপর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশটি সংশোধন করে "ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬" হিসেবে পাস করা হয়। আইন পাস হওয়ার পরই সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পাঁচজন সাবেক পরিচালক ও স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন।
বিএবি-এর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। অনাদায়ী ঋণ বা খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে ভয়াবহভাবে। ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। মূলধন ঘাটতি বাড়ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ঋণ আদায়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। অর্থ সংগ্রহের খরচ বাড়ছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে।
বিএবি বলছে, এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো "আস্থা সংকট"। মানুষের মধ্যে ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমানতকারীরা নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএবি কয়েকটি সুপারিশও দিয়েছে।
প্রথমত, তারা বলেছে ব্যাংকারদের জন্য বিদ্যমান ইনসেনটিভ বোনাস চালু রাখতে হবে, যাতে দক্ষ কর্মীরা ব্যাংকিং খাত ছেড়ে না যান। দ্বিতীয়ত, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে, তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্স স্কিমে সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, তারা ঋণের শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন সংক্রান্ত নিয়ম সহজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিএবি -এর দাবি, বর্তমান নিয়মের কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত মূলধন চাপ তৈরি হচ্ছে, ফলে তারা নতুন ঋণ দিতে পারছে না।
এছাড়া তারা একটি জাতীয় "অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি" গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কিনে নেবে এবং পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। তারা উদাহরণ হিসেবে মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে এ ধরনের মডেল সফল হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এই খাতের স্থিতিশীলতা শুধু ব্যাংকের জন্য নয়, সাধারণ আমানতকারী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী-সবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন দেখার বিষয় হলো- সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানে পৌঁছায়। কারণ একদিকে দরকার কঠোর জবাবদিহিতা ও সুশাসন, অন্যদিকে প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
Comments