অবাস্তব উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার বাজেট প্রণয়ন করছে
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে কাজ করছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২০.০৭ শতাংশ বেশি। এর মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা গত বছর নেমে দাঁড়িয়েছিল ৬.৮ শতাংশে।
প্রতিবছরই অর্থ মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, কিন্তু তা অনেক ব্যবধানে পূরণ হয় না। এবার সেই ব্যবধান যতটা সম্ভব কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে একক ভ্যাট হার চালু করা এবং কর অব্যাহতি কমানো।
কতটা অবাস্তব এই লক্ষ্যমাত্রা তা হিসে্ব দেখলেই বোঝা যায়। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬,০৪,০০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের ৫,০৩,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে এনবিআরকে গত বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশের বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে,যদিও প্রথম আট মাসে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২.৪ শতাংশ।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে,আগামী বছরের লক্ষ্য পূরণে রাজস্ব সংগ্রহ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে যা শুধু অসম্ভব নয়, অতি নিপীড়নমূলক হয়ে দাঁড়ায় কিনা জনমনে সেই শঙ্কাও কাজ করছে।
রাজস্ব বাড়াতে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে,তার মধ্যে রয়েছে একাধিক ভ্যাট হার বাতিল করে একক হার চালু করা। পাশাপাশি ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় দেওয়া কর ছাড় কমানো হবে।
এছাড়া কর ফাঁকির ক্ষেত্র চিহ্নিত করা,ভ্যাট আদায় ও কাঠামো যৌক্তিক করা এবং টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন-ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে,যা আয়কর আদায় বাড়াতে সহায়ক হবে।
কাস্টমস ও আয়কর বিভাগে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের তথ্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে,ফলে তথ্য বিনিময় ও যাচাই আরও সহজ হবে। এতে কর নির্ধারণ ও আদায় প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
এছাড়া বিশ্বব্যাংকের ১,০০০ কোটি টাকার অর্থায়নে "স্ট্রেন্থেনিং ডমেস্টিক রেভিনিউ মোবিলাইজেশন" প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এনবিআরের কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাল করা হবে।
ভ্যাট নিবন্ধনের সীমা কমানো হয়েছে: তালিকাভুক্তির সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকায় এবং নিবন্ধনের সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে ২.৫ লাখ টাকায় নামানো হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি আয়ের ১৩ শতাংশ আসে এনবিআরের বাইরে থেকে কর ও কর-বহির্ভূত উৎস থেকে। আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআর-বহির্ভূত করের লক্ষ্যমাত্রা ২৫,০০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে,যা চলতি বছরের ২০,০০০ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। তবে প্রথম আট মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৫,৭৮৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে,কর-বহির্ভূত আয় তুলনামূলক ভালো করেছে-৬৫,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪০,০০০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আগামী বছর এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ৬৬,০০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো বিশ্বে অন্যতম কম। সরকার আগামী অর্থবছরে এই অনুপাত ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্য ছিল ৮.৬ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল ৬.৮ শতাংশ।
আসন্ন বাজেটে আয়কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ আয়করদাতা থাকলেও ভ্যাট প্রদানকারীর সংখ্যা ৮ লাখেরও কম। ভ্যাট আদায় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আনা হবে।
Comments