মমতার দেড় দশকের সাম্রাজ্য কেন তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল?
২০১১ সালে যে বিপুল জনজোয়ারে ভর করে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ঠিক ১৫ বছর পর ২০২৬ সালে এসে সেই একই ভাগ্যবরণ করতে হলো তৃণমূল কংগ্রেসকে। টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পর মমতার এই 'অপরাজেয়' দুর্গের পতন রাজনৈতিক মহলে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরাজয় কেবল বিরোধী শিবিরের সাফল্য নয়, বরং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ফাটল এবং 'কর্পোরেট রাজনীতি'র ভিড়ে পুরনো যোদ্ধাদের হারিয়ে ফেলার এক করুণ উপাখ্যান।
'নবীন-প্রবীণ' দ্বন্দ্ব ও আস্থার সংকট
তৃণমূলের এই পতনের বীজ বপন করা হয়েছিল অনেক আগেই। ২০১১ সালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতিতে আগমনের পর থেকেই দলে একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিষেক প্রভাবশালী হয়ে উঠলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক ময়নাতদন্ত বলছে, মমতার রাজনীতির যে শক্তিশালী 'মিডল অর্ডার' ছিল, তাদের অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়াই দলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্পোরেট সংস্কৃতি বনাম মাঠের রাজনীতি
তৃণমূলের মূল শক্তি ছিল মাটির কাছাকাছি থাকা নেতাদের ব্যক্তিগত জনসংযোগ। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আই-প্যাক এর মতো পরামর্শদাতা সংস্থার দাপট বাড়লে দলের ভেতরে 'কর্পোরেট সংস্কৃতি' জেঁকে বসে।
- অসম্মানিত প্রবীণ: সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো বর্ষীয়ান নেতারা আক্ষেপ করেছিলেন যে, রাজনৈতিক মাঠে পোড় খাওয়া নেতাদের এখন তরুণদের লিখে দেওয়া স্ক্রিপ্ট পড়তে হচ্ছে।
- সাংগঠনিক অবক্ষয়: মুড়ি-তেলেভাজার ঘরোয়া রাজনীতির জায়গা যখন ডাটা অ্যানালিটিক্স দখল করে নিল, তখন মাঠের কর্মীরা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
মুকুল-শুভেন্দু প্রস্থান: অপূরণীয় ক্ষতি
দলের দুই প্রধান স্তম্ভ মুকুল রায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর দলত্যাগ তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ২০১৭ সালে মুকুল রায়ের বিদায়ের পর সংগঠন নড়বড়ে হয়, আর ২০২০ সালে শুভেন্দুর বিজেপিতে যোগ দেওয়া ছিল চূড়ান্ত আঘাত। নন্দীগ্রামে খোদ মমতাকে পরাজিত করে শুভেন্দু প্রমাণ করেছিলেন যে, তৃণমূলের নিজস্ব ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
'নতুন তৃণমূল' ও দ্বিমুখী নীতি
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় 'নতুন তৃণমূল' গড়ার ডাক দিলেও তা কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ ছিল।
- এক ব্যক্তি এক পদ: এই নীতি প্রবর্তনের চেষ্টা করা হলেও ফিরহাদ হাকিমের মতো প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা যায়নি।
- নেতৃত্বের সংকট: একদিকে দুর্নীতির অভিযোগে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতাদের কারাবাস, অন্যদিকে নতুন দক্ষ নেতৃত্ব তৈরিতে ব্যর্থতা—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে তৃণমূলের 'ব্যাটিং অর্ডার' তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
জনমুখী প্রকল্প বনাম সাংগঠনিক ক্ষত
'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' বা 'যুবসাথী'র মতো জনপ্রিয় প্রকল্পগুলো তৃণমূলকে জনসমর্থন জোগালেও দলের ভেতরকার ক্যানসার সারাতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতি করতে গিয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের মনের ভাষা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের ক্ষোভ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা মানুষকে দিলেও, দলীয় নেতাদের দুর্নীতি ও দাম্ভিকতা সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, ব্যালট বাক্সে তারই প্রতিফলন ঘটেছে ২০২৬-এ।
Comments